সার্বভৌমত্বের প্রচলিত ধারণা এখন বৈশ্বিক নানা সংকটের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বে কোনো সমস্যা নির্দিষ্ট একটি দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। তাই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অংশ নেওয়াও জরুরি।
শুক্রবার সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সিনেট ভবনে আইন বিভাগের আয়োজনে ‘সমসাময়িক বিশ্বে সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইন’ শীর্ষক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে সার্বভৌমত্বের ধারণা আজ অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে। কোনো সমস্যা এখন আর একটি ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। তাই সার্বভৌমত্বের অর্থ শুধু স্বাধীনভাবে চলা নয়, বরং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অংশ নেওয়াও এর অংশ।’
বিশ্বজুড়ে শক্তির প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি বিশ্বজুড়ে দিন দিন বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। পৃথিবীর দিকে তাকালেই আমরা এর উদাহরণ দেখতে পাই। শালীনতার খাতিরে আমি নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম বলতে চাই না। তবে আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত মানবতা ও মানবাধিকার।’
মানুষের জীবনের মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে সহজে বিসর্জন দেয়া যায় এমন পণ্য বা সম্পদ হলো মানুষের জীবন। আমি আমার এই মতের ওপর অটল। এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। আমরা কি এমন একটি দিনের কথা বলতে পারি, যেদিন কোনো একটি দেশ, এমনকি কোনো একটি শহরেও একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি? এমন কোনো দিনের কথা কি আপনার মনে পড়ে? আমার তো পড়ে না।’
অধিকারের বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বাঘের অধিকার, কচ্ছপের অধিকার, এমনকি শিশুদের অধিকার, শ্রমের অধিকার, শ্রমিকদের অধিকার- এভাবে আমরা অধিকারের নানা শ্রেণিবিভাগ করে থাকি। কিন্তু মানবাধিকার তো মানবাধিকারই। আমরা অধিকারের নানা বিষয় নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, অধিকারের আগে থাকা ‘মানব’ শব্দটিই যেন ভুলে গেছি।’
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, সমসাময়িক বিশ্বে সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইন পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বায়ন, সশস্ত্র সংঘাত, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, অসমতা এবং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এসব ধারণার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একাডেমিক আলোচনা ও বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে যৌথ গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘চ্যালেঞ্জগুলো অনুধাবন করতে এবং কার্যকর আইনী ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ খুঁজে বের করতে একাডেমিক আলোচনা ও আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা একান্ত প্রয়োজন।’
সার্বভৌমত্বকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতি হিসেবে উল্লেখ করে উপাচার্য আরও বলেন, ‘এর পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা রক্ষা, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।’
বিশ্বের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় আইনের ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আব্দুল আলিম। তিনি বলেন, ‘সশস্ত্র সংঘাত, বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈষম্যের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ন্যায়বিচার, শান্তি, জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইন নিয়ে আলোচনার জন্য আমরা যখন এখানে সমবেত হয়েছি, তখন আমাদের জাতির যাত্রাপথের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন।’
দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্ব শেষে প্রফেসর বেগম আসমা সিদ্দীকার সভাপতিত্বে একটি প্লিনারি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি ল স্কুলের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. মো. রফিকুল ইসলাম এবং মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ের আইন অনুষদের প্রফেসর দাতিন মেরি জর্জ।
প্রবন্ধ দুটির ওপর আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর নকীব মু. নসরুল্লাহ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর আবু নাসের মো. ওয়াহিদ।
আয়োজকদের নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে চারটি একাডেমিক সেশনে মোট ১২৪টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইন বিভাগের শিক্ষার্থী এস এম রিদওয়ান জুনায়েদ ও তাসনিম তাইয়েবা।
মন্তব্যসমূহ