ইসরাইলের পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। সাধারণ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের পরও ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি কোনো প্রধান রাজনৈতিক দল। ফলে ক্ষমতায় যেতে জোট গঠন ও রাজনৈতিক সমঝোতার কঠিন পরীক্ষায় পড়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট।
এবারের নির্বাচনে ১৯টি আসন পাওয়া আরব দলগুলো সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাদের সমর্থন পেলে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন শিবিরের পক্ষে ৬৭ আসনের জোট গঠন সম্ভব। তবে আরব দলগুলোকে সরাসরি সরকারে অন্তর্ভুক্ত না করে বাইরে থেকে সমর্থন নিয়েও সংখ্যালঘু সরকার পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু এ ধরনের জোট গঠন আইজেনকোট ও তাঁর ইহুদি মিত্রদের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের অধিকাংশেরই পারিবারিক শিকড় ফিলিস্তিনে। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে দেশটির ইহুদি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ আরব দলগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারে না।
ইসরাইলের ইতিহাসে ২০২১ সালে একবারই আরব দল সরকার গঠনের জোটে অংশ নিয়েছিল। তবে সেই সরকার টিকেছিল মাত্র ১৮ মাস। এদিকে নেতানিয়াহু ইতোমধ্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে বিরোধী শিবিরের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।
জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা
সরকার গঠনের আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো আইজেনকোট ও তাঁর ডানপন্থী সহযোগীদের নিজেদের শিবিরে টেনে নেওয়া। নেতানিয়াহু এ পথে সফল হলে ৬৭ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর পাশাপাশি অতি-অর্থোডক্স ও উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো বিরোধী দলে চলে যেতে পারে।
এ ধরনের সরকার অর্থনৈতিক সংস্কার এবং অতি-অর্থোডক্সদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতির মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই সমঝোতার পথে বড় বাধা নেতানিয়াহুর অতীত ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের অনাস্থা।
২০২৩ সালের অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার অভিযোগ এবং চলমান দুর্নীতি মামলার কারণে আইজেনকোট ও তাঁর সহযোগীরা নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকার গঠনে অংশ না নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। বিরোধী জোটের ভোটারদের অন্যতম দাবি হলো ওই ঘটনাগুলোর রাষ্ট্রীয় তদন্ত। কিন্তু নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার এমন তদন্তের অনুমতি দেবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করতে হলে নেতানিয়াহুকে তাঁর দীর্ঘদিনের অনুগত মিত্রদেরও ছেড়ে দিতে হতে পারে।
বিরোধী জোটে ভাঙন ধরাতে পারেন নেতানিয়াহু
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। এ ক্ষেত্রে তাঁর সাবেক ডানপন্থী মিত্র নাফতালী বেনেট ও অবিগদোর লিবারম্যানকে নিজের শিবিরে ফেরানোর উদ্যোগ নিতে পারেন তিনি।
অধিকৃত অঞ্চলে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান থাকায় বেনেট ও লিবারম্যানের জন্য আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন কঠিন। তবে নেতানিয়াহুর সঙ্গেও তাঁদের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে অতি-অর্থোডক্সদের সেনাবাহিনীতে যোগদান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে তাঁরা দুজনই কঠোর বিরোধী।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর শিবির থেকে কোনো সদস্যকে নিজেদের পক্ষে আনা আইজেনকোটের জন্য প্রায় অসম্ভব। কারণ, নেতানিয়াহুর দলের সদস্যরা তাঁর প্রতি অত্যন্ত অনুগত।
নতুন নির্বাচনের আশঙ্কা
শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে আবারও নির্বাচনে যেতে হতে পারে ইসরাইলকে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছরের শুরুতে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তত দিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে।
নতুন নির্বাচন বিরোধী শিবিরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে বিদেশ থেকে হাজার হাজার ইসরাইলি নাগরিক দেশে এসেছিলেন। দ্বিতীয়বার নির্বাচনের আয়োজন হলে তাঁদের সবাই আবারও ভোট দিতে ফিরবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে নতুন নির্বাচন পর্যন্ত পাওয়া সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজের জোট আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবেন নেতানিয়াহু। এর আগে ২০১৯ সালের নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থার জেরে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে পাঁচবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইসরাইলে।
সূত্র: এপি।
মন্তব্যসমূহ