জাতিসংঘে জাইমা রহমানের নতুন দায়িত্ব, আইন কর্মকর্তা হিসেবে কী কাজ করবেন?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। এ পদে তার নিয়োগ, দায়িত্ব এবং যোগ্যতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্ন ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে।জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাইমা রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ অফিসের অধীনে আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করবেন।সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কর্মকর্তাদের তালিকাতেও জাইমা রহমানের নাম ও পদবি উল্লেখ রয়েছে। ওই কার্যালয়ে কর্মরত ৪০ জনের তালিকায় জাইমা রহমান ছাড়াও আরও পাঁচজন বাংলাদেশি রয়েছেন।আইন কর্মকর্তা হিসেবে জাইমা রহমান মূলত সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে বিভিন্ন আইনি বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। সভাপতির কার্যালয়ের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ পদটি জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার বিষয় নয়; বরং সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকে সভাপতিকে আইনি বিষয়ে সহায়তা করার দায়িত্ব রয়েছে।সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার সময় কোনো প্রস্তাব কীভাবে উত্থাপন করা হবে, কোনো দেশ পয়েন্ট অব অর্ডার তুললে সভাপতি কী ধরনের রুলিং দেবেন কিংবা কোনো প্রস্তাবের সংশোধনী গ্রহণযোগ্য কি না—এসব বিষয়ে সভাপতিকে আইনি পরামর্শ দিতে পারেন আইন কর্মকর্তা।সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। এসব ক্ষেত্রে সভাপতির সিদ্ধান্ত যাতে জাতিসংঘ সনদ, বিধি ও প্রচলিত রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সে বিষয়ে আইনি পরামর্শ দেওয়াও আইন কর্মকর্তার দায়িত্বের অংশ। অতীতের নজির ও জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিধান তুলে ধরে সভাপতিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা হয়।এ ছাড়া সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব বা রেজুলেশন আগের নিয়ম কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, বাজেটসংক্রান্ত কোনো প্রস্তাবে অন্য কোনো কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন কি না—এসব বিষয়ও আইন কর্মকর্তা যাচাই করতে পারেন।সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমান যেসব দায়িত্ব পালন করবেন, সেগুলোর আইনি দিক দেখভাল ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়াই জাইমা রহমানের কাজের অন্যতম অংশ হবে।সভাপতির কার্যালয়ের সঙ্গে জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগসহ অন্যান্য আইনি সংস্থার সমন্বয় করা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি বা আইনি বিষয়ে সভাপতিকে বক্তব্য দিতে হলে তার খসড়া তৈরিতেও আইন কর্মকর্তা সহায়তা করতে পারেন। সামগ্রিকভাবে সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যক্রম যাতে জাতিসংঘের আইন ও রীতির মধ্যে থাকে, সে বিষয়টির আইনি দিক দেখভাল করাই এ পদের অন্যতম দায়িত্ব।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ওই কার্যালয়ে ৪০ জনের একটি দল কাজ করছে। ২৯টি দেশের নাগরিকদের নিয়ে গঠিত এ দলে ছয়টি ভাষাভাষি মানুষের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। বাংলাদেশি সদস্যদের মধ্যে কূটনীতিক মো. আব্দুল আলিম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন, মফিজুল ইসলাম, জাকির আহমেদ ও মো. রফিকুল আলম মোল্লার নাম রয়েছে। তাদের সঙ্গে আইন কর্মকর্তা হিসেবে জাইমা রহমানও যুক্ত হয়েছেন।সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে জাতিসংঘের স্থায়ী কর্মীদের পাশাপাশি সভাপতি নিজের এখতিয়ার অনুযায়ী কয়েকজনকে যুক্ত করতে পারেন। তার মতে, সভাপতির কার্যালয়ে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটি অনেকাংশে সভাপতির এখতিয়ারের বিষয়। তবে এ ধরনের পদে দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতার একটি মানদণ্ড থাকে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত আন্তর্জাতিক আইনে অভিজ্ঞ এবং বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা জাতিসংঘে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন আইনজীবীদের এ ধরনের দায়িত্বে দেখা যায়। এ কারণে জাইমা রহমানের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানকে ব্যারিস্টার এবং আইন ও নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন ও রাজনীতি বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ‘দ্য অনারেবল সোসাইটি অব দ্য ইনার টেম্পল’ থেকে সনদও পেয়েছেন জাইমা রহমান। এ ছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশে একজন তালিকাভুক্ত অ্যাডভোকেট হিসেবেও তিনি কাজ করছেন বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।যুক্তরাজ্যে আবাসন, জনকল্যাণ ও শ্রম আইন নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে আইনি পরামর্শ ও জনসংযোগ এবং সামাজিক কল্যাণ ও শিক্ষা আইনে ‘প্রো বোনো’ বা বিনামূল্যে আইনি সেবার অভিজ্ঞতার কথাও তার প্রোফাইলে উল্লেখ রয়েছে। সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক জননীতি, ডিজিটাল নিরাপত্তা, বিচার পাওয়ার অধিকার, শিক্ষা ও লিঙ্গসমতা নিয়েও তার কাজের আগ্রহ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদের মতে, সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা জাইমা রহমানের রয়েছে। তার ভাষ্য, এ দায়িত্ব আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জনেরও একটি সুযোগ।তিনি বলেন, সভাপতি যেসব দায়িত্ব পালন করবেন, সেগুলোর আইনি দিক থেকে সহায়তা করাই আইন কর্মকর্তার কাজ। তবে এসব কাজ একা আইন কর্মকর্তাকেই করতে হয় না; প্রয়োজন অনুযায়ী তার সঙ্গে একটি দলও কাজ করতে পারে।
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম