ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

৫২ বছরে পর্যবেক্ষণকৃত বন্যপ্রাণীর জনসংখ্যা কমেছে ৭৩ শতাংশ

৫২ বছরে পর্যবেক্ষণকৃত বন্যপ্রাণীর জনসংখ্যা কমেছে ৭৩ শতাংশ
ছবি: সংগৃহীত
ফলো করুন

বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণীর জনসংখ্যা গত ৫২ বছরে গড়ে ৭৩ শতাংশ কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস, অতিরিক্ত শিকার ও আহরণ এবং দূষণের মতো মানবসৃষ্ট বিভিন্ন চাপের কারণে প্রকৃতির ওপর এ সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডব্লিউডব্লিউএফ)।

বুধবার (৭ অক্টোবর) প্রকাশিত ডব্লিউডব্লিউএফের ‘লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট (LPR) ২০২৬’-এ ১৯৭০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণীর সংখ্যা পরিবর্তনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের জন্য ৫ হাজার ৭৯০ প্রজাতির ৩৫ হাজার ৮০৩টি জনসংখ্যার প্রবণতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে স্তন্যপায়ী, পাখি, মাছ, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণী রয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৭৩ শতাংশ পতনের অর্থ পৃথিবীর মোট ৭৩ শতাংশ বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে—এমন নয়। বরং ১৯৭০ সালের তুলনায় পর্যবেক্ষণ করা প্রাণীদের জনসংখ্যার গড় আকার ৭৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রাণীর পাল, ঝাঁক বা বিচরণকারী গোষ্ঠীর আকার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়েছে।

বাস্তুতন্ত্র অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিঠাপানির প্রাণী। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যার গড় পতন ৮৫ শতাংশ। স্থলভাগের প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৯ শতাংশ এবং সামুদ্রিক প্রাণীদের ক্ষেত্রে ৫৯ শতাংশ।

অঞ্চলভেদে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে। সেখানে পর্যবেক্ষণ করা বন্যপ্রাণীর জনসংখ্যার গড় আকার ৯৫ শতাংশ কমেছে। আফ্রিকায় পতনের হার ৮০ শতাংশ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ৪৯ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসস্থল ধ্বংস ও অবক্ষয়। এর পর রয়েছে অতিরিক্ত আহরণ বা শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার এবং বিভিন্ন রোগ। এসব চাপ খাদ্য উৎপাদন, জ্বালানি ব্যবহার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বিশেষ করে নদী ও হ্রদগুলোতে সংকট দ্রুত বাড়ছে। নদী দখল, দূষণ, বাঁধ নির্মাণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মিঠাপানির বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরই প্রতিফলন হিসেবে মিঠাপানির প্রাণীদের জনসংখ্যায় ৮৫ শতাংশ পতন দেখা গেছে।

তবে বন্যপ্রাণীর পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষণ করা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হয় স্থিতিশীল রয়েছে, নয়তো বেড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ স্থিতিশীল এবং ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাঘ, সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ, দক্ষিণ আফ্রিকার হাতি এবং আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের ব্লুফিন টুনার কিছু জনসংখ্যার পুনরুদ্ধারকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ উদ্যোগ, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং আবাসস্থল রক্ষার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

ডব্লিউডব্লিউএফের মতে, শুধু কয়েকটি প্রজাতিকে রক্ষা করলেই জীববৈচিত্র্যের সামগ্রিক সংকট কাটানো সম্ভব নয়। প্রকৃতির ওপর চাপ তৈরি করা খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনার পাশাপাশি দ্রুত ও ব্যাপক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

জেডএসএলের বিজ্ঞানীদের তৈরি লিভিং প্ল্যানেট ইনডেক্সের তথ্য পৃথিবীর বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যের একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, প্রকৃতির ক্ষতি গুরুতর হলেও এই পতন অনিবার্য নয়। যেসব ক্ষেত্রে মানুষের উদ্যোগে প্রাণীর সংখ্যা পুনরুদ্ধার হয়েছে, সেগুলো দেখায় যে সঠিক পদক্ষেপ নিলে প্রকৃতিও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

তবে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে মানুষের জীবনধারণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পরাগায়ন, পানি, খাদ্য, মাটি ও জলবায়ুর ভারসাম্য। ফলে বন্যপ্রাণীর ৭৩ শতাংশ পতনের এই হিসাব মানুষের ভবিষ্যতের জন্যও বড় সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ট্যাগ : জলবায়ু পরিবর্তন বন্যপ্রাণী ডব্লিউডব্লিউএফ

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

বাংলা ভিউজ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


৫২ বছরে পর্যবেক্ষণকৃত বন্যপ্রাণীর জনসংখ্যা কমেছে ৭৩ শতাংশ

প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণীর জনসংখ্যা গত ৫২ বছরে গড়ে ৭৩ শতাংশ কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস, অতিরিক্ত শিকার ও আহরণ এবং দূষণের মতো মানবসৃষ্ট বিভিন্ন চাপের কারণে প্রকৃতির ওপর এ সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডব্লিউডব্লিউএফ)।

বুধবার (৭ অক্টোবর) প্রকাশিত ডব্লিউডব্লিউএফের ‘লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট (LPR) ২০২৬’-এ ১৯৭০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণীর সংখ্যা পরিবর্তনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের জন্য ৫ হাজার ৭৯০ প্রজাতির ৩৫ হাজার ৮০৩টি জনসংখ্যার প্রবণতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে স্তন্যপায়ী, পাখি, মাছ, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণী রয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৭৩ শতাংশ পতনের অর্থ পৃথিবীর মোট ৭৩ শতাংশ বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে—এমন নয়। বরং ১৯৭০ সালের তুলনায় পর্যবেক্ষণ করা প্রাণীদের জনসংখ্যার গড় আকার ৭৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রাণীর পাল, ঝাঁক বা বিচরণকারী গোষ্ঠীর আকার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়েছে।

বাস্তুতন্ত্র অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিঠাপানির প্রাণী। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যার গড় পতন ৮৫ শতাংশ। স্থলভাগের প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৯ শতাংশ এবং সামুদ্রিক প্রাণীদের ক্ষেত্রে ৫৯ শতাংশ।

অঞ্চলভেদে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে। সেখানে পর্যবেক্ষণ করা বন্যপ্রাণীর জনসংখ্যার গড় আকার ৯৫ শতাংশ কমেছে। আফ্রিকায় পতনের হার ৮০ শতাংশ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ৪৯ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসস্থল ধ্বংস ও অবক্ষয়। এর পর রয়েছে অতিরিক্ত আহরণ বা শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার এবং বিভিন্ন রোগ। এসব চাপ খাদ্য উৎপাদন, জ্বালানি ব্যবহার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বিশেষ করে নদী ও হ্রদগুলোতে সংকট দ্রুত বাড়ছে। নদী দখল, দূষণ, বাঁধ নির্মাণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মিঠাপানির বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরই প্রতিফলন হিসেবে মিঠাপানির প্রাণীদের জনসংখ্যায় ৮৫ শতাংশ পতন দেখা গেছে।

তবে বন্যপ্রাণীর পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষণ করা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হয় স্থিতিশীল রয়েছে, নয়তো বেড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ স্থিতিশীল এবং ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাঘ, সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ, দক্ষিণ আফ্রিকার হাতি এবং আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের ব্লুফিন টুনার কিছু জনসংখ্যার পুনরুদ্ধারকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ উদ্যোগ, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং আবাসস্থল রক্ষার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

ডব্লিউডব্লিউএফের মতে, শুধু কয়েকটি প্রজাতিকে রক্ষা করলেই জীববৈচিত্র্যের সামগ্রিক সংকট কাটানো সম্ভব নয়। প্রকৃতির ওপর চাপ তৈরি করা খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনার পাশাপাশি দ্রুত ও ব্যাপক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

জেডএসএলের বিজ্ঞানীদের তৈরি লিভিং প্ল্যানেট ইনডেক্সের তথ্য পৃথিবীর বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যের একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, প্রকৃতির ক্ষতি গুরুতর হলেও এই পতন অনিবার্য নয়। যেসব ক্ষেত্রে মানুষের উদ্যোগে প্রাণীর সংখ্যা পুনরুদ্ধার হয়েছে, সেগুলো দেখায় যে সঠিক পদক্ষেপ নিলে প্রকৃতিও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

তবে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে মানুষের জীবনধারণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পরাগায়ন, পানি, খাদ্য, মাটি ও জলবায়ুর ভারসাম্য। ফলে বন্যপ্রাণীর ৭৩ শতাংশ পতনের এই হিসাব মানুষের ভবিষ্যতের জন্যও বড় সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ