অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঠেকাতে সারা দেশে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আরবান ডেভেলপমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইউডিডি)কে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কোথায় কী ধরনের উন্নয়ন হওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করে জোনিং করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বুধবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে আয়োজিত স্মার্ট সিটি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় গত সাত মাস ধরে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছে মন্ত্রণালয়। ইউডিডি প্রথমবারের মতো ১০ বছরের একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। এর আওতায় প্রথমে মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে কাজ করা হবে। পরে বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জাকারিয়া তাহের বলেন, “মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া কাজ করা মানে একটা লক্ষ্যে চারটা তীর ছোড়ার মতো, কোনোটায় যেন লাগে। কিন্তু আমরা প্রিসাইজলি কাজ করতে চাচ্ছি।”
তিনি বলেন, পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য ইউডিডিকে শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং এই বিভাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে চায় সরকার।
সঠিক পরিকল্পনার জন্য পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, সর্বশেষ শুমারি অনেক আগে হয়েছে। তাই পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে নতুন একটি উপযুক্ত শুমারি করা প্রয়োজন।
ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার উদ্যোগের কথা জানান তিনি। আর্কিটেকচার, স্ট্রাকচারাল ও ইলেক্ট্রো প্ল্যানিং সমন্বিতভাবে করার চেষ্টা চলছে। পরিকল্পনা অনুমোদনের পর ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়ার ক্ষেত্রে নকশা প্রণয়নকারীদের মাধ্যমে ভবনটি সঠিকভাবে নির্মিত হয়েছে কি না, তা প্রত্যয়ন করার ব্যবস্থা করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, ধানমন্ডির মতো রাজউক ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এলাকার অনেক ভবনের পরিকল্পনা রাজউক অনুমোদন করেছে। তবে এসব এলাকার বাইরে পরিকল্পনা ছাড়াই নির্মিত অনেক ভবন রয়েছে। সেগুলো চিহ্নিত করার কাজ চলছে।
গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিলের পরিবেশ নিয়েও সরকারের উদ্বেগের কথা জানান তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০ বাড়িঘর রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাড়িতে পরিকল্পনার সময় সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল থাকার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। পাশাপাশি অনেক নামিদামি ডেভেলপার বর্জ্য পরিশোধনের জন্য এসটিপি ব্যবহার করেননি।
এ সমস্যা সমাধানে গুলশান, বনানী ও বারিধারা সোসাইটির সঙ্গে তিন থেকে চারবার বৈঠক হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এসব বৈঠকে রাজউক চেয়ারম্যান, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী এবং ঢাকা ওয়াসার এমডিসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
জাকারিয়া তাহের বলেন, “আমি বলেছি, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। গুলশান, বারিধারা আমাদের ডিস্টিংগুইশড এরিয়া; সেখানকার লেকের পানিই যদি আমরা ঠিক করতে না পারি, সারা বাংলাদেশ কীভাবে ঠিক করব?”
দেশের নগর উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতারও আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, সরকার বিভিন্ন প্রস্তাব গ্রহণে আগ্রহী এবং দেশের কল্যাণে প্রয়োজনীয় মনে হলে সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে রাজউকের আদলে গত সাত মাসে আরও ছয়টি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এগুলো হলো—ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও বরিশাল। এর আগে আরও চারটি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ছিল। পর্যায়ক্রমে বগুড়া নিয়েও কাজ করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, ডেভেলপমেন্ট অথরিটি না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনই পরিকল্পনা অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে। এতে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স থাকে না। ঢাকার বছিলার মতো এলাকায় বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে পরিকল্পনা অনুমোদনের ঘটনাও রয়েছে। এসব বিষয়কে একটি সামগ্রিক আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে।
পরিকল্পনা ছাড়া ভবন নির্মাণ কিংবা অনুমোদিত পরিকল্পনার বাইরে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। তার আশা, এটি মাসখানেকের মধ্যে মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে। বিধিমালা পাস হলে সুপারভিশন আইন আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
আবাসন খাতে অর্থায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি মর্টগেজ সুবিধা প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোর মতো ৩০ বছরের জন্য মর্টগেজ সুবিধা না থাকলে এ শ্রেণির মানুষের জন্য আবাসন তৈরি কঠিন। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত এগিয়ে এলে সরকার সহযোগিতা করবে বলে জানান তিনি।
বেসরকারি আবাসন খাতের নীতিমালায় আগে বিভিন্ন সমস্যা ছিল উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন নীতিমালা করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বেসরকারি আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পরিকল্পনার মধ্যেই কাজ করতে হবে এবং আগের কাজ যথাযথভাবে হয়েছে কি না, তার ওপর পরবর্তী পরিকল্পনা অনুমোদন নির্ভর করবে।
ঢাকার বাসযোগ্যতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গৃহায়ণমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাসযোগ্য ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকা ১৭১তম অবস্থানে রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরকে উন্নত করতে যথাযথ পরিকল্পনার পাশাপাশি সব খাতের সম্মিলিত অবদান প্রয়োজন।
মন্তব্যসমূহ