যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ও বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এবার স্থল বাণিজ্যেও বড় বাধার মুখে পড়েছে ইরান। পাকিস্তান, ইরাক ও তুরস্ক সীমান্তে বিধিনিষেধ আরোপ করায় দেশটির পণ্য পরিবহন ও বৈদেশিক বাণিজ্য আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের গত শুক্রবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ ও ট্রানজিট বিধিনিষেধের কারণে ইরানের স্থলপথে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ লেনদেন ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে স্থল সীমান্তে নতুন বিধিনিষেধ ইরানের বাণিজ্যিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার লক্ষ্যে চাপ বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তান ও ইরাকে সীমান্ত বিধিনিষেধ
পাকিস্তান তাদের গুরুত্বপূর্ণ গাবদ-রিমদান ও তাফতান সীমান্ত ক্রসিংয়ে কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। বর্তমানে এসব পথ দিয়ে শুধু ইরানি গ্যাসের ট্যাংকার এবং পচনশীল ফল ও সবজির চালান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
ইসলামাবাদ জানিয়েছে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ চোরাচালান প্রতিরোধে নিরাপত্তাজনিত কারণে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সরাসরি নির্দেশে চাজাবেহ ও আল-শাইবের সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করা হয়েছে। ইরাকি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, মাদক পরিবহন ও জাল মুদ্রা পাচারকারী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চালু থাকা সীমান্ত ক্রসিংয়ের সংখ্যা কমাতে ইরাক সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।
তুরস্ক সীমান্তেও কড়াকড়ি
ইরান থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের প্রধান স্থল করিডোর হিসেবে পরিচিত বাজারগান সীমান্ত ক্রসিংয়েও বিধিনিষেধের মুখে পড়েছে তেহরান। তুরস্ক সম্প্রতি এই পথে ইরানি ট্রাক প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সীমান্ত অবকাঠামো দিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা রয়েছে। তবে বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ২০০ থেকে ৩০০টি ট্রাক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
এতে বিকল্প পথে পণ্য পরিবহনের চেষ্টা করা ইরানি ব্যবসায়ীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে ইরান ইন্টারন্যাশনাল।
বিকল্প বাণিজ্যপথেও সীমাবদ্ধতা
ইরানের সঙ্গে তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া ও আফগানিস্তানের স্থলসীমান্ত চালু থাকলেও এসব পথ দিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য বন্ধের ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও অন্যান্য জটিলতা বিকল্প পথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। যুদ্ধের কারণে আর্থিক সক্ষমতা চাপে থাকায় স্থলপথে বাণিজ্য পুনর্বিন্যাস করার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে চিহ্নিত আলী রেজাইয়ের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন, এ ধরনের অবরুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষতি ডেকে আনবে। তবে তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে তেহরানকে ওয়াশিংটনের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করা যাবে না।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
মন্তব্যসমূহ