সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে তুরস্কের রাজনীতিতে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে আছেন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। ২০২৩ সালের নির্বাচনেও জয়ী হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সমর্থকদের কাছে তিনি শক্তিশালী নেতৃত্ব ও উন্নয়নের প্রতীক, আর সমালোচকদের কাছে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার জন্য বিতর্কিত এক নেতা।১৯৫৪ সালে ইস্তাম্বুলে জন্ম নেওয়া এরদোয়ান তরুণ বয়সে ফুটবল খেলেছেন এবং রাজনীতিতে প্রবেশের আগে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৪ সালে তিনি ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। পরে একটি কবিতা আবৃত্তিকে কেন্দ্র করে দেওয়া বক্তব্যের মামলায় কারাগারে যেতে হয় তাকে এবং রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়েন।২০০১ সালে তিনি জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি—একেপি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। দুই বছর পর প্রধানমন্ত্রী হন। তার শাসনের প্রথম দশকে তুরস্কে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কার হয়।এরদোয়ানের রাজনৈতিক অবস্থান বদলের গুরুত্বপূর্ণ সময় আসে ২০১৩ সালের গেজি পার্ক বিক্ষোভ এবং ২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর। অভ্যুত্থানচেষ্টার পর ব্যাপক গ্রেপ্তার, সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয় সরকার। মানবাধিকার সংগঠন ও বিরোধীরা এসব পদক্ষেপকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন হিসেবে সমালোচনা করেছে; সরকার বলেছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষায় এসব ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল।২০১৭ সালের গণভোটের মাধ্যমে তুরস্ক সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে নির্বাহী প্রেসিডেন্টশাসিত ব্যবস্থায় যায়। নতুন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত হয় এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। তাই “সীমাহীন ক্ষমতা” বলার চেয়ে “প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়” বলা বেশি নির্ভুল।এরদোয়ানের শাসনে ধর্মীয় পরিচয়ের প্রকাশে রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের কিছু অংশ শিথিল হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে হিজাব ব্যবহারের বাধা কমানো এবং ২০২০ সালে ঐতিহাসিক হাগিয়া সোফিয়াকে আবার মসজিদে রূপান্তর তার সমর্থকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।পররাষ্ট্রনীতিতেও এরদোয়ান তুরস্ককে স্বতন্ত্র অবস্থানে রাখার চেষ্টা করেছেন। ন্যাটোর সদস্য হয়েও আঙ্কারা রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে মধ্যস্থতার ভূমিকাও পালন করেছে।তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোলু ২০২৫ সালের মার্চে গ্রেপ্তার হন এবং দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিচারাধীন রয়েছেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিরোধী দল ও অধিকার সংগঠনগুলো মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করলেও তুরস্ক সরকার বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইমামোলুর গ্রেপ্তারের পর তুরস্কে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। ২০২৬ সালেও তার সমর্থনে বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। একই সঙ্গে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তুরস্কে বিরোধী রাজনীতি ও নাগরিক স্বাধীনতার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।সব মিলিয়ে এরদোয়ানের রাজনৈতিক জীবন তুরস্কের সাম্প্রতিক ইতিহাসের বড় পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত—অর্থনৈতিক উত্থান, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন, ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক, আঞ্চলিক প্রভাব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে চলমান বিতর্ক—সব ক্ষেত্রেই তার দীর্ঘ শাসনের গভীর প্রভাব রয়েছে।সূত্র: বিবিসি,