ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দেশের মানুষের রক্ত ঝরিয়ে যারা দেশ ছেড়ে গেছেন, তাঁদের ফিরে এসে আবার ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা জনগণ মেনে নেবে না।
রোববার (৮ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) মিলনায়তনে ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ছাত্রদল আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন তিনি।
শেখ হাসিনার ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, ‘এত মানুষের রক্ত ঝরিয়ে, এত নির্যাতন চালিয়ে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে দেশ পরিচালনা করেছেন যিনি, তিনি এখন বলছেন, ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসবেন। কিন্তু এ দেশের মানুষের চোখের সামনে এখনও ভাসছে সেই তরতাজা শিশু-কিশোর ও তরুণদের মুখ, যারা বুক পেতে বুলেট গ্রহণ করেছিলেন। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে মহিমান্বিত গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, সেই বিপ্লব কি মুছে ফেলা যাবে? আবু সাঈদের আত্মত্যাগ, মুগ্ধের আত্মত্যাগ, ওয়াসিম আকরামের আত্মত্যাগ– এসব কি মুছে ফেলা যাবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা হঠাৎ প্যারাসুট দিয়ে নেমে আসবেন, সবাই ঢোল বাজিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাবে– এটি কি কখনও সম্ভব? বাংলার মাটি বীরের মাটি। এই মাটি বহু বীরের জন্ম দিয়েছে। যারা নিজের দেশের মানুষের রক্ত ঝরিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, তারা আবার উড়ে এসে জুড়ে বসবেন, আর জনগণ তা মেনে নেবে– এটি কোনও দিনই সম্ভব নয়।’
আলোচনায় ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ৭ নভেম্বরের চেতনার মধ্যে মিল রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন রিজভী। তাঁর ভাষ্য, মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। তিনি বলেন, ‘মানুষের ভেতরে ভেতরে যে ক্ষোভ জমে উঠেছিল, তার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। সেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাও ছিল ৭ নভেম্বরের চেতনা। অর্থাৎ আধিপত্যবাদী শক্তি এবং তাদের এ দেশীয় অনুচররা যতই চেষ্টা করুক, ১৮ কোটি মানুষের এই দেশকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। বাংলাদেশকে কখনও আধিপত্যবাদের থাবার মধ্যে নিয়ে আসা যাবে না।’
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, দিনটি শুধু বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা নয়, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ দিন বিদেশি প্রভাবমুক্ত পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতি গ্রহণ এবং স্বাধীনভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেতনা তৈরি হয়েছিল।
রিজভী বলেন, ‘৭ নভেম্বর বিদেশি প্রভাবমুক্ত পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়ন এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সূচনা করেছিল। বাংলাদেশ কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, কার সঙ্গে বৈরিতা থাকবে, কার সঙ্গে চুক্তি করবে– এসব বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের নিজস্ব ব্যাপার। এটি কারও নির্দেশে, কারও অঙ্গুলিহেলনে কিংবা কারও কথায় পরিচালিত হবে না।’
দিবসটি পালনে অতীতের বাধার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৬ সাল থেকেই দিবসটি সরকারিভাবে পালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘ ১৭ বছর এটি সরকারিভাবে পালন করতে দেওয়া হয়নি। তবে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন সংগঠন দিবসটি পালন করেছে। ফলে ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য ও অন্তর্নিহিত চেতনা কখনও মুছে যায়নি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস উল্লেখ করে রিজভী বলেন, সংগঠনটির নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে বারবার হামলার শিকার হয়েছেন। তাঁদের ত্যাগ দেশের তরুণ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মনোভাব গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, তিনি একটি দক্ষ ও চৌকস সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এবং সেনাবাহিনীর রাজনীতিকরণ চাননি। তাঁর মতে, বর্তমান আধুনিক সেনাবাহিনী জিয়াউর রহমানের অবদান।
এ সময় বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের প্রশংসা করে তারেক রহমানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। রিজভী বলেন, শত আক্রমণ ও হুমকির মধ্যেও তারেক রহমান দলকে সঠিক পথে পরিচালনা করছেন। ৭ নভেম্বরকে বিপদের সময়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া একটি কম্পাসের সঙ্গে তুলনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। সঞ্চালনায় ছিলেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।














মন্তব্যসমূহ