বিগত সরকারের সময়ে প্রকাশিত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে উল্লেখযোগ্য অসংগতি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তাঁর দাবি, ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে এসব গরমিলের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা শেষে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মিলনায়তনে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব তথ্য উঠে আসে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য এবং নীতিগত ভুল চিহ্নিত করতে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অপরিহার্য। সে কারণে সরকারি তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।
তিনি জানান, বিগত সরকারের সময়ের পরিসংখ্যান যাচাই করতে ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করা হয়েছে। বিশেষ করে জিডিপির হিসাব নিয়ে আগে যেসব প্রশ্ন উঠেছিল, পর্যালোচনায় সেসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট অসংগতি পাওয়া গেছে।
তবে জিডিপির কোন বছরের হিসাবে কতটুকু গরমিল রয়েছে, সে বিষয়ে অনুষ্ঠানে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়নি। অডিট প্রতিবেদন প্রকাশের পর এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।
একই অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতীতে পরিসংখ্যান ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল। পুরোনো তথ্য যাচাইয়ের সময় জিডিপির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির হিসাবেও ব্যাপক অসংগতি পাওয়া গেছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যাঁদের সহায়তা পাওয়ার কথা ছিল, তাঁদের অনেকে সেই সুবিধা পাননি।
সরকারি তথ্যের অসংগতির উদাহরণ দিতে গিয়ে নৌযানের সংখ্যার বিষয়টি তুলে ধরেন তিতুমীর। তিনি জানান, আগে দেশে নৌযানের সংখ্যা ১৩ হাজার দেখানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী পর্যালোচনায় প্রকৃত সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার পাওয়া গেছে।
এ ধরনের পার্থক্য দূর করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল নিবন্ধন তথ্য বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিতুমীর বর্তমান সময়ে মিথ্যা তথ্যের বিস্তারকে একধরনের ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারি পরিসংখ্যানের স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, প্রশ্নবিদ্ধ তথ্য দিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর একটি হলো সঠিক তথ্য। তাই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
ফরেনসিক অডিটের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে অর্থমন্ত্রী জানান, অতীতের অনিয়মের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করা নয়।
তাঁর মতে, সরকারি তথ্য যত বেশি উন্মুক্ত হবে, তত বেশি ভুল ও অসংগতি চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এতে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগও তৈরি হবে।
পরিসংখ্যান ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ডিজিটাল অবকাঠামো ও তথ্যের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে বিবিএসের জনবল সংকট নিরসনের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা পরিসংখ্যান নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, ভোক্তা মূল্যসূচকসহ (সিপিআই) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান এখন বিবিএস নিজেই প্রকাশ করছে। এসব তথ্য প্রকাশের জন্য মন্ত্রীর স্বাক্ষরের প্রয়োজন হচ্ছে না।
পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক।
আলোচনায় আরও অংশ নেন বিবিএসের পরিচালক কবির উদ্দিন আহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ শাহাদৎ হোসেন এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।














মন্তব্যসমূহ