ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সম্পর্ক নতুন করে টানাপড়েনের মুখে পড়েছে। ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে রিয়াদের অসন্তোষের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন সৌদি আরবে থাকা মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের একটি গোয়েন্দা সূত্র টাইমস অব ইসরাইলকে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্ককে আগের চেয়ে অনেক বেশি শীতল করে দিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনেও একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলো নিরাপদে সরিয়ে নিতে এবং ওই নৌপথে ইরানের প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেছিল। এই অভিযানের জন্য সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু রিয়াদ অনুমতি না দেওয়ায় ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি বাতিল করে।
তবে সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় তিনি দুই দিনেরও কম সময়ের মধ্যে অভিযান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে হোয়াইট হাউস রিয়াদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ স্থগিত রাখার হুমকি দেয়। সৌদি আরব এসব ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাচ্ছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনার বিষয়টিও এখন ওয়াশিংটনের বিবেচনায় রয়েছে।
সম্পর্কের এই শীতলতার আরেকটি ইঙ্গিত দেখা যায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক উপসাগরীয় সফরে। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন সফর করলেও সৌদি আরবে যাননি। রিয়াদ এটিকে কূটনৈতিকভাবে উপেক্ষা করার ঘটনা হিসেবে দেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও প্রত্যাখ্যান করেন। ওই সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে সৌদি অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল এ সিদ্ধান্ত।
যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব ট্রাম্প প্রশাসনকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, ইরানের সরকার উৎখাতের চেষ্টা সফল না হলে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এতে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু করলে সৌদি নেতৃত্বের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তাদের ধারণা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মার্কিন নীতিনির্ধারণে রিয়াদের প্রভাব খুব সীমিত।
যুদ্ধ শুরুর পর শুরুতে আপত্তি থাকলেও সৌদি আরবসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেয়। কারণ, ইরানের পাল্টা হামলার চাপ শেষ পর্যন্ত ওই দেশগুলোকেই সামলাতে হচ্ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাকে লক্ষ্য করে কয়েকটি হামলা চালায়। জবাবে ইরান সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে হামলা চালায়। এরপর উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে আরও জোরালো অবস্থান নেয় রিয়াদ।
ইরানের বিরুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধারাবাহিক হামলা নিয়েও সৌদি আরব উদ্বেগ প্রকাশ করে। রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। সৌদি আরব চাইছিল, যুক্তরাষ্ট্র যেন আমিরাতকে হামলা বন্ধ করে কূটনৈতিক উদ্যোগে যোগ দিতে চাপ দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কেও টানাপড়েন বেড়েছে। ইরান ইস্যু সেই দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। গত এপ্রিলে আমিরাত সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেক জোট থেকে সরে যাওয়ায় দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য আরও প্রকাশ্যে আসে।
যুদ্ধ চলাকালে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়ার অনুরোধও জানায়। তবে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এতে রাজি হননি।
পরে পক্ষগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য একটি সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। তবে সাম্প্রতিক গোলাগুলির ঘটনায় সেই সমঝোতা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন, প্রয়োজনে এই সময়সীমা পরিবর্তন করা যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমঝোতা আলোচনায় ইসরাইলের কোনো ভূমিকা ছিল না। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। তবে সমঝোতার শর্তে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের জন্য যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে ইসরাইলের কর্মকর্তারা এই সমঝোতার বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, এতে যুদ্ধের মূল লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা কিংবা দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরি করার কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল
মন্তব্যসমূহ