ইয়েমেনের হুথিদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের কূটনৈতিক উপদেষ্টা ড. আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর হামলা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গারগাশ বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো সবাই একই ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে এবং তাদের নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
তিনি বলেন, আগ্রাসনকারীরা উপসাগরীয় দেশগুলোকে দুর্বল প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে ভুল করেছে। সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও এখন সবাই লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়েছে। তাই কোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে শুধু সেই দেশের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গারগাশের ভাষায়, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা একটি যৌথ দায়িত্ব। এ কারণে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা নতুন করে জোরদার করা এবং সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। দীর্ঘদিনের ঘাটতিগুলোই প্রতিপক্ষকে আরও আগ্রাসী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যেই গারগাশের এই বক্তব্য এলো। গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বড় ধরনের হামলার পর একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটছে। হামলার পর বিমানবন্দরটির কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতের বড় পর্ব শুরু হয় ২০১৫ সালে। ওই সময় হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট অভিযান শুরু করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও ওই জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে ইয়েমেনে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনে ইউএই। তবে সীমিতসংখ্যক বিশেষায়িত বাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে দেশটিতে অবস্থান করছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে সেই অবশিষ্ট বাহিনীও প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় আবুধাবি।
২০২২ সালে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা কমানোর একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর পরিস্থিতি আবার দ্রুত অবনতির দিকে যায়। ইয়েমেনের সরকার জানিয়েছিল, একটি ইরানি বিমান অবতরণ ঠেকাতেই বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালানো হয়েছিল। এরপর সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুথিদের পাল্টা হামলা শুরু হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে বাব আল-মানদেব। সেপ্টেম্বর মাসে হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ এবং মোখা ও ধুবাবের আশপাশের এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের ওপর হামলা শুধু একটি দেশের নিরাপত্তা ইস্যু নয়, বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও সমুদ্রপথে হামলা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও পড়তে পারে।
আর সেই কারণেই এবার উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে শুধু রাজনৈতিক সংহতি নয়, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় আরও কার্যকর যৌথ ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দিচ্ছে ইউএই।
সূত্র: খালিজ টাইমস
মন্তব্যসমূহ