ঢাকা    শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ ১২ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

ডিউটিরত অবস্থায় ইউনিফর্ম পরে ভিডিও, পুলিশের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কী বলছে নির্দেশনা

ডিউটিরত অবস্থায় ইউনিফর্ম পরে ভিডিও, পুলিশের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কী বলছে নির্দেশনা
এইআই জেনারেট ফটো
ফলো করুন

ডিউটিরত অবস্থায় পুলিশের ইউনিফর্ম পরে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের গাড়ি, চেকপোস্ট, থানা কিংবা দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের জন্য ভিডিও তৈরি ও প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে কিছু পুলিশ সদস্যকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় একজন পুলিশ সদস্য ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন কি না। বিশেষ করে অপারেশনাল কার্যক্রম, অভিযান, গ্রেপ্তার, চেকপোস্ট কিংবা দায়িত্ব পালনের দৃশ্য ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে প্রকাশের ক্ষেত্রে পুলিশের নিজস্ব নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

বাংলাদেশ পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০২৫-এ এ বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। নির্দেশিকার ১০.১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো পুলিশ সদস্য তাঁর অপারেশনাল কার্যক্রমের ভিডিও বা স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করতে পারবেন না। একই নির্দেশিকার ৬.৫ অনুচ্ছেদে দায়িত্ব পালনকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকার বিষয়টিকে অসদাচরণ ও কর্তব্যে অবহেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্দেশিকার ১২ নম্বর ধারায় বিধান অমান্যের ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও রয়েছে।

অপারেশনাল ভিডিও প্রকাশে অনুমতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

পুলিশের দায়িত্বের অংশ হিসেবে কোনো অভিযান, গ্রেপ্তার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা তদন্তের প্রয়োজনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হতে পারে। তবে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে ধারণ করা সেই ছবি বা ভিডিও ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা আলাদা বিষয়।

বিশেষ করে কোনো অপারেশনাল কার্যক্রমের ভিডিও ব্যক্তিগত ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০২৫-এর ১০.১২ অনুচ্ছেদেও এ বিষয়ে পূর্বানুমতির কথা বলা হয়েছে।


ইউনিফর্ম পরে ব্যক্তিগত কনটেন্ট

পুলিশের পোশাক একজন সদস্যের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পরিচায়ক। তাই ইউনিফর্ম পরে ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও তৈরি করা হলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি তখন ডিউটিতে ছিলেন কি না, ভিডিও তৈরির কারণে দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যাঘাত ঘটেছে কি না, ভিডিওতে দাপ্তরিক বা অপারেশনাল তথ্য প্রকাশ পেয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল কি না, এসব বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছেন, পুলিশের পোশাক পরে কনটেন্ট তৈরি করে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে দেওয়ার সুযোগ নেই এবং এটি নিয়মের ব্যত্যয়। তিনি জানান, এ ধরনের ঘটনায় এর আগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আরও কিছু অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।


ডিউটির সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের প্রশ্ন

দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ, লাইভ সম্প্রচার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকার বিষয়টিও নির্দেশনার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ। একজন পুলিশ সদস্যের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের সময়ে যদি ব্যক্তিগত কনটেন্ট তৈরিতে সময় ব্যয় হয়, তাহলে সেটি কর্তব্য পালনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে কি না, তা বিভাগীয়ভাবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষ করে নিরাপত্তা দায়িত্ব, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, চেকপোস্ট, পাহারা, অভিযান কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ব্যক্তিগত কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার অবকাশ রয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নির্দেশনা

পুলিশের নিজস্ব নির্দেশনার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্যও সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯ (পরিমার্জিত সংস্করণ)’ প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০২০ সালের ৭ মে এক পরিপত্রের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওই নির্দেশিকা অনুসরণের কথা জানায়।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর ওই নির্দেশিকায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরেও পরবর্তী সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওই নির্দেশিকা অনুসরণের বিষয়ে আদেশ জারি করা হয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের জুলাইয়েও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশিকাটি অনুসরণের বিষয়ে অফিস আদেশ জারি হয়েছে।

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট হলেও জবাবদিহির বাইরে নয়

কোনো পুলিশ সদস্যের ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যক্তিগত হলেও সেখানে সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় বিধি ও নির্দেশনা প্রযোজ্য হতে পারে।

বিশেষ করে কোনো পোস্ট বা ভিডিওতে অপারেশনাল তথ্য, দাপ্তরিক গোপনীয় তথ্য, তদন্তাধীন মামলার তথ্য কিংবা কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ পেলে তা আলাদাভাবে বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।


নাগরিকের গোপনীয়তার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ

অভিযান, গ্রেপ্তার বা তদন্তের সময় ধারণ করা ভিডিওতে আটক ব্যক্তি, ভুক্তভোগী, সাক্ষী কিংবা অন্য কোনো নাগরিকের ছবি ও পরিচয় থাকতে পারে। সেই ফুটেজ ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গোপনীয়তা ও মামলার তদন্তের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, পুলিশ তদন্তের প্রয়োজনে ভিডিও ধারণ করতে পারে; তবে তদন্তের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ করলে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রশ্ন তৈরি হয়।


ইউনিফর্ম পরা মানেই ফৌজদারি অপরাধ নয়

তবে শুধু পুলিশের ইউনিফর্ম পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে বলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফৌজদারি অপরাধ বলা যায় না। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে ভিডিওটি কোথায় ও কী উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তখন ডিউটিতে ছিলেন কি না, কোনো অপারেশনাল তথ্য প্রকাশ হয়েছে কি না, দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত ঘটেছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা বা কর্তৃপক্ষের আদেশ লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সেসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

তবে পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০২৫ অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা এবং অনুমতি ছাড়া অপারেশনাল কার্যক্রমের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে ‘নিজের মোবাইল, নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট’ যুক্তি দেখিয়ে দায়িত্ব পালনের সময় যেকোনো ধরনের কনটেন্ট প্রকাশের সুযোগ রয়েছে, এমনটি নির্দেশনা থেকে বলা যায় না।

বিভাগীয় ব্যবস্থার সুযোগ

পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০২৫-এর বিধান অমান্যের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি বিভাগীয় জবাবদিহির আওতায় আসতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকেও নির্দেশনা না মানার অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

ফলে ডিউটিরত অবস্থায় ইউনিফর্ম পরে ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও তৈরির বিষয়টি শুধু অনলাইন কনটেন্ট তৈরির প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে দায়িত্ব পালনের শৃঙ্খলা, অপারেশনাল নিরাপত্তা, দাপ্তরিক গোপনীয়তা, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য এবং পুলিশের পেশাগত আচরণের বিষয়ও জড়িত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পুলিশ সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিদ্যমান নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ডিউটির সময় ব্যক্তিগত কনটেন্ট তৈরি এবং অপারেশনাল কার্যক্রমের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও বিভাগীয় বিধি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলা ভিউজ

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ডিউটিরত অবস্থায় ইউনিফর্ম পরে ভিডিও, পুলিশের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কী বলছে নির্দেশনা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ডিউটিরত অবস্থায় পুলিশের ইউনিফর্ম পরে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের গাড়ি, চেকপোস্ট, থানা কিংবা দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের জন্য ভিডিও তৈরি ও প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে কিছু পুলিশ সদস্যকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় একজন পুলিশ সদস্য ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন কি না। বিশেষ করে অপারেশনাল কার্যক্রম, অভিযান, গ্রেপ্তার, চেকপোস্ট কিংবা দায়িত্ব পালনের দৃশ্য ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে প্রকাশের ক্ষেত্রে পুলিশের নিজস্ব নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

বাংলাদেশ পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০২৫-এ এ বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। নির্দেশিকার ১০.১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো পুলিশ সদস্য তাঁর অপারেশনাল কার্যক্রমের ভিডিও বা স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করতে পারবেন না। একই নির্দেশিকার ৬.৫ অনুচ্ছেদে দায়িত্ব পালনকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকার বিষয়টিকে অসদাচরণ ও কর্তব্যে অবহেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্দেশিকার ১২ নম্বর ধারায় বিধান অমান্যের ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও রয়েছে।


অপারেশনাল ভিডিও প্রকাশে অনুমতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

পুলিশের দায়িত্বের অংশ হিসেবে কোনো অভিযান, গ্রেপ্তার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা তদন্তের প্রয়োজনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হতে পারে। তবে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে ধারণ করা সেই ছবি বা ভিডিও ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা আলাদা বিষয়।

বিশেষ করে কোনো অপারেশনাল কার্যক্রমের ভিডিও ব্যক্তিগত ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০২৫-এর ১০.১২ অনুচ্ছেদেও এ বিষয়ে পূর্বানুমতির কথা বলা হয়েছে।


ইউনিফর্ম পরে ব্যক্তিগত কনটেন্ট

পুলিশের পোশাক একজন সদস্যের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পরিচায়ক। তাই ইউনিফর্ম পরে ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও তৈরি করা হলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি তখন ডিউটিতে ছিলেন কি না, ভিডিও তৈরির কারণে দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যাঘাত ঘটেছে কি না, ভিডিওতে দাপ্তরিক বা অপারেশনাল তথ্য প্রকাশ পেয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল কি না, এসব বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছেন, পুলিশের পোশাক পরে কনটেন্ট তৈরি করে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে দেওয়ার সুযোগ নেই এবং এটি নিয়মের ব্যত্যয়। তিনি জানান, এ ধরনের ঘটনায় এর আগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আরও কিছু অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।


ডিউটির সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের প্রশ্ন

দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ, লাইভ সম্প্রচার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকার বিষয়টিও নির্দেশনার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ। একজন পুলিশ সদস্যের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের সময়ে যদি ব্যক্তিগত কনটেন্ট তৈরিতে সময় ব্যয় হয়, তাহলে সেটি কর্তব্য পালনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে কি না, তা বিভাগীয়ভাবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষ করে নিরাপত্তা দায়িত্ব, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, চেকপোস্ট, পাহারা, অভিযান কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ব্যক্তিগত কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার অবকাশ রয়েছে।


সরকারি কর্মচারীদের জন্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নির্দেশনা

পুলিশের নিজস্ব নির্দেশনার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্যও সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯ (পরিমার্জিত সংস্করণ)’ প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০২০ সালের ৭ মে এক পরিপত্রের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওই নির্দেশিকা অনুসরণের কথা জানায়।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর ওই নির্দেশিকায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরেও পরবর্তী সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওই নির্দেশিকা অনুসরণের বিষয়ে আদেশ জারি করা হয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের জুলাইয়েও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশিকাটি অনুসরণের বিষয়ে অফিস আদেশ জারি হয়েছে।

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট হলেও জবাবদিহির বাইরে নয়

কোনো পুলিশ সদস্যের ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যক্তিগত হলেও সেখানে সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় বিধি ও নির্দেশনা প্রযোজ্য হতে পারে।

বিশেষ করে কোনো পোস্ট বা ভিডিওতে অপারেশনাল তথ্য, দাপ্তরিক গোপনীয় তথ্য, তদন্তাধীন মামলার তথ্য কিংবা কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ পেলে তা আলাদাভাবে বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।


নাগরিকের গোপনীয়তার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ

অভিযান, গ্রেপ্তার বা তদন্তের সময় ধারণ করা ভিডিওতে আটক ব্যক্তি, ভুক্তভোগী, সাক্ষী কিংবা অন্য কোনো নাগরিকের ছবি ও পরিচয় থাকতে পারে। সেই ফুটেজ ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গোপনীয়তা ও মামলার তদন্তের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, পুলিশ তদন্তের প্রয়োজনে ভিডিও ধারণ করতে পারে; তবে তদন্তের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ করলে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রশ্ন তৈরি হয়।


ইউনিফর্ম পরা মানেই ফৌজদারি অপরাধ নয়

তবে শুধু পুলিশের ইউনিফর্ম পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে বলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফৌজদারি অপরাধ বলা যায় না। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে ভিডিওটি কোথায় ও কী উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তখন ডিউটিতে ছিলেন কি না, কোনো অপারেশনাল তথ্য প্রকাশ হয়েছে কি না, দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত ঘটেছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা বা কর্তৃপক্ষের আদেশ লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সেসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

তবে পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০২৫ অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা এবং অনুমতি ছাড়া অপারেশনাল কার্যক্রমের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে ‘নিজের মোবাইল, নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট’ যুক্তি দেখিয়ে দায়িত্ব পালনের সময় যেকোনো ধরনের কনটেন্ট প্রকাশের সুযোগ রয়েছে, এমনটি নির্দেশনা থেকে বলা যায় না।


বিভাগীয় ব্যবস্থার সুযোগ

পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০২৫-এর বিধান অমান্যের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি বিভাগীয় জবাবদিহির আওতায় আসতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকেও নির্দেশনা না মানার অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

ফলে ডিউটিরত অবস্থায় ইউনিফর্ম পরে ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও তৈরির বিষয়টি শুধু অনলাইন কনটেন্ট তৈরির প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে দায়িত্ব পালনের শৃঙ্খলা, অপারেশনাল নিরাপত্তা, দাপ্তরিক গোপনীয়তা, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য এবং পুলিশের পেশাগত আচরণের বিষয়ও জড়িত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পুলিশ সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিদ্যমান নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ডিউটির সময় ব্যক্তিগত কনটেন্ট তৈরি এবং অপারেশনাল কার্যক্রমের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও বিভাগীয় বিধি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ