গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) পুলিশ কমিশনার হিসেবে ১১ মাস ১৯ দিন দায়িত্ব পালন করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. ইসরাইল হাওলাদার। ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৬ সালের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি জিএমপির নেতৃত্ব দেন। মোট ৩৫৩ দিন অতিবাহিত হয়; দায়িত্ব গ্রহণ ও বিদায়ের দিনসহ ৩৫৪টি ক্যালেন্ডার দিন। এই সময়ে মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মাদক ও সন্ত্রাস দমন, গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, তদন্তের মানোন্নয়ন, জনসম্পৃক্ত পুলিশিং, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পুলিশ সদস্যদের কল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন তিনি।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই গাজীপুর মহানগরের আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা, অগ্নিসন্ত্রাস প্রতিরোধ ও সড়ক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন ইসরাইল হাওলাদার। ২০ নভেম্বর ২০২৫ জিএমপি সদর দপ্তরে বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতিমূলক সভায় অংশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে চলমান কার্যক্রম ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অবহিত হন। জনগণ ও তাঁদের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ ধৈর্য, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে পুলিশ ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মহানগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেন তিনি। ২৩ নভেম্বর ২০২৫ জিএমপি সদর দপ্তরে গাজীপুরে কর্মরত বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সভায় সাংবাদিকদের বক্তব্য, পরামর্শ ও মহানগরের আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা শোনেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করাকে তাঁর অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।
অপরাধ দমনে গোয়েন্দা তৎপরতা ও জনসম্পৃক্ত পুলিশিংকে বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি চান্দনা চৌরাস্তা মসজিদ মার্কেট এলাকায় আয়োজিত অপরাধ দমন পথসভায় অংশ নিয়ে গাজীপুর মহানগরকে অপরাধমুক্ত ও জননিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশ একা নয়, দলমত নির্বিশেষে জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। জনগণকে পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
গোয়েন্দা কার্যক্রমকে আধুনিক, তথ্যনির্ভর ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। ১২ জুলাই ২০২৬ মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জুয়া, মাদক, সন্ত্রাস, সাইবার অপরাধ, পর্নোগ্রাফি, হানি ট্র্যাপ, ভিসা জালিয়াতি, ভেজাল ওষুধ ও খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেন। প্রয়োজনে ছদ্মবেশে অভিযান পরিচালনা এবং ২৪ ঘণ্টা গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন। বিশেষ করে অপরাধপ্রবণ এলাকা, মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ এবং রাতের বেলায় দূরপাল্লার বাসের যাত্রাবিরতির স্থানগুলোতে নজরদারি জোরদারের কথা বলেন।
মাদকবিরোধী অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে তাঁর দায়িত্বকালে। ১৫ মার্চ রাত পৌনে ১২টার দিকে টঙ্গীর হাজীর মাজার বস্তি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ মাদকবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেন তিনি। অভিযানে জিএমপির পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি, সিআইডি, পিবিআইসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা অংশ নেন। বস্তির বিভিন্ন গলি, বাসাবাড়ি ও সন্দেহভাজন স্থানে তল্লাশি চালানো হয়। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান জানিয়ে তিনি বলেন, এলাকায় মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনেন তিনি। ৪ মার্চ ২০২৬ জিএমপির ১৭ জন পুলিশ পরিদর্শককে একযোগে বদলি ও পদায়ন করা হয়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, গোয়েন্দা শাখা, ট্রাফিক ও তদন্ত বিভাগে এসব পদায়ন পরিবর্তন কার্যকর হয়। কমিশনারের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর কার্যক্রমে গতিশীলতা আনা এবং মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে এটি ছিল উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জিএমপির অর্জন এবং চ্যালেঞ্জ তুলে ধরতে ৭ জুলাই ২০২৬ সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। সেখানে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসের অপরাধসংক্রান্ত পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে জিএমপির আটটি থানায় ১ হাজার ৪৫৪টি মামলা রুজু হয় এবং বিশেষ অভিযানে ৩ হাজার ২১৭ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে ৪৬ জন ছিনতাইকারী, ২৩ জন ডাকাত এবং ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ৩৫৪ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য তুলে ধরা হয়।
একই সময়ে মাদকবিরোধী অভিযানে ৯৮৮ জন মাদক ব্যবসায়ী ও ৯০১ জন মাদকসেবীকে আইনের আওতায় আনার তথ্য জানান তিনি। অভিযানে ৫১ হাজার ৫৬০ পিস ইয়াবা, ৩৫৭ কেজি গাঁজা, ১ কেজি ৯৬৫ গ্রাম হেরোইন, ৫৩০ পিস প্যাথিডিন এবং ৪৬ লিটার দেশীয় মদসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়। মাদকসংক্রান্ত ৮১২টি এবং অস্ত্রসংক্রান্ত ৬০টি মামলা দায়েরের তথ্যও তুলে ধরেন। এ সময়ে ১০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ২০ রাউন্ড গুলি, চারটি ম্যাগাজিন এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
নারী ও শিশু সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন তিনি। ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং সুরক্ষাসংক্রান্ত ১৭৬টি মামলা রুজুর তথ্য জানান। এ ছাড়া হত্যা ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধের মামলার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। একই সময়ে অপহরণ ও হানি ট্র্যাপের মতো অপরাধ প্রতিরোধে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গোয়েন্দা নজরদারির ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসে উদ্ধার হওয়া ২০টি মরদেহের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ১৯টির পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক অপরাধ ও ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা প্রতিরোধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। টঙ্গী পূর্ব থানা এলাকায় ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সংঘাত ও অবৈধ প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে পরিচালিত অভিযানে ১৮ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য সংবাদ সম্মেলনে জানান তিনি। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং দমনে সদস্যদের হালনাগাদ তালিকা তৈরির উদ্যোগ এবং মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের কথাও তুলে ধরেন।
নির্বাচনকালীন জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও মাঠপর্যায়ে তৎপর ছিলেন তিনি। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গাজীপুর মহানগরীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা প্রস্তুতি, দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের কার্যক্রম ও সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করেন। ভোটাররা যাতে শান্তিপূর্ণ ও নির্ভয়ে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে জন্য দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নির্দেশনা দেন।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পুলিশি সেবার মান বৃদ্ধিতেও তাঁর দায়িত্বকালে কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর্যায়ে আসে। ৩০ মার্চ ২০২৬ গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল কলেজগেট এলাকায় পূবাইল থানার স্থায়ী চারতলা ভবন নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। দীর্ঘদিন ভাড়া স্থাপনায় পরিচালিত থানাটির জন্য নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আধুনিক ও যুগোপযোগী পুলিশি সেবা নিশ্চিত করা, পুলিশ সদস্যদের উন্নত কর্মপরিবেশ তৈরি এবং সেবাপ্রত্যাশী মানুষের জন্য সহজ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাই ছিল এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
এরপর ৭ এপ্রিল ২০২৬ কোনাবাড়ী থানার নতুন ভবন নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। নগরীর হরিণাচালা এলাকায় থানার নিজস্ব জমিতে ভবনটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করা হয়। আধুনিক পুলিশি সেবা, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং জনগণের জন্য দ্রুত ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। দীর্ঘদিন ভাড়া জায়গায় পরিচালিত থানার নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্যোগ জিএমপির অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও উন্নত করার বিষয়েও উদ্যোগ নেন তিনি। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জিএমপিতে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের আউটলেট প্যাথলজি ল্যাব উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত এবং চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্বোধনের পর ল্যাব, রেজিস্ট্রেশন কাউন্টার ও মেডিকেল অফিসারের কক্ষ পরিদর্শন করেন এবং নিজেও রক্ত পরীক্ষা করান। নতুন এ ব্যবস্থার মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের দ্রুত ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সমস্যা সমাধান এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতেও নিয়মিত সভা আয়োজন করেন তিনি। ১০ সেপ্টেম্বর মাসিক কল্যাণ ও অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন। কল্যাণ সভায় পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যা, আবেদন ও প্রয়োজনীয়তার বিষয় শোনেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে ফোর্সের কল্যাণের পাশাপাশি সেবাপ্রত্যাশী জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়ার জন্য আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
অপরাধ পর্যালোচনা সভায় মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অনুদ্ঘাটিত মামলার রহস্য উদ্ঘাটন, দ্রুত তদন্ত ও নিষ্পত্তি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা দেন। পেশাদারিত্বে সাফল্য অর্জনকারী পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করেন। ১২ ও ১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মাসিক কল্যাণ ও অপরাধ পর্যালোচনা সভাতেও একইভাবে পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। অবসরজনিত বিদায় উপলক্ষে পুলিশ সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টিও এসব কার্যক্রমে গুরুত্ব পায়।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। ২৫ জুন ২০২৬ আসন্ন রথযাত্রা উপলক্ষে জিএমপি সদর দপ্তরে সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক মতবিনিময় সভা করেন। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, উদ্বেগ ও পরামর্শ শোনেন এবং রথযাত্রা শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ উপলক্ষে ১৮ ও ১৯ অক্টোবর মহানগরীর সদর, টঙ্গী পূর্ব ও টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। মণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদযাপন নিশ্চিত করতে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেন।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রমে অংশ নেন তিনি। ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬-এর অংশ হিসেবে গাজীপুরের শ্মশানঘাট-জয়দেবপুর এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে অংশ নেন। উদ্বোধনের পর নিজেও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিয়ে ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করেন। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জাতীয় দিবস ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন তিনি। ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে গাজীপুর মহানগরের কেন্দ্রীয় শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতেও অংশ নেন। এসব কর্মসূচিতে জিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। ২ এপ্রিল ২০২৬ জিএমপি সদর দপ্তরে ঈদ পুনর্মিলনী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অভিযোগ ও মামলার সঠিক তদন্ত নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা জানান। তিনি বলেন, তদন্তের মানোন্নয়ন ছাড়া অপরাধ দমন ও বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা সম্ভব নয়। অপরাধের ধরন, ঘটনার সময় ও স্থান, আলামত সংগ্রহ এবং পূর্ববর্তী অপরাধের সঙ্গে যোগসূত্র বিশ্লেষণের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। আধুনিক অপরাধ দমনে প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তৎপরতা ও তথ্য বিশ্লেষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
১৪ মার্চ ২০২৬ আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের গাজীপুর সফর উপলক্ষে জিএমপির আয়োজনে গাজীপুর জেলা পুলিশ লাইন্সে সুধী সমাবেশ ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি, সুধী সমাজের প্রতিনিধি, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং জনসেবামূলক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার বিষয়ে আলোচনা হয়। পুলিশ কমিশনার হিসেবে তিনি এ আয়োজনের মাধ্যমে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।
জনগণের হারানো সম্পদ উদ্ধার ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও জিএমপির কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। তাঁর দিকনির্দেশনায় জিএমপির এলআইসি শাখা ৫৮টি হারানো মোবাইল ফোন উদ্ধার করে। ১১ মার্চ ২০২৬ জিএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উদ্ধার করা ফোনগুলো প্রকৃত মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে নাগরিকদের হারানো সম্পদ উদ্ধারে প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশি সেবার বিষয়টি সামনে আসে।
পেশাগত জীবনে মো. ইসরাইল হাওলাদার ১৭তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের কর্মকর্তা। ১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শিল্পাঞ্চল পুলিশের ডিআইজি, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস)সহ পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালের ২৩ আগস্ট অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সেমিনার এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করেছেন।
দায়িত্বকালের শেষ পর্যায়ে ৩ নভেম্বর ২০২৬ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে শিল্পাঞ্চল পুলিশের প্রধান হিসেবে পদায়ন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৭ নভেম্বর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ পুলিশের ঐতিহ্যবাহী আনুষ্ঠানিকতায় তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, উপ-পুলিশ কমিশনারসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সহকর্মীরা তাঁর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিচারণ করেন এবং নতুন কর্মস্থলে তাঁর সফলতা কামনা করেন।
সব মিলিয়ে ১১ মাস ১৯ দিনের দায়িত্বকালে মো. ইসরাইল হাওলাদারের নেতৃত্বে জিএমপির প্রকাশ্যে নথিভুক্ত কার্যক্রমে অপরাধ দমন, মাদকবিরোধী অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, তদন্তের মানোন্নয়ন, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, থানা ভবন নির্মাণ, পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসাসেবা, জনসম্পৃক্ত পুলিশিং এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পরিসংখ্যানভিত্তিক পর্যালোচনা এবং পুলিশ ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন শেষে নতুন কর্মস্থল শিল্পাঞ্চল পুলিশের নেতৃত্বে তাঁর নতুন কর্মপর্ব শুরু হয়।














মন্তব্যসমূহ