দেশের মহাসড়কে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা, ডাকাতি-ছিনতাই প্রতিরোধ, যানজট নিরসন, মাদক ও অপরাধ দমন এবং পুলিশি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ফারুক আহমেদ। ২০২৬ সালের ৭ জুলাই হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ৩ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩ নভেম্বরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ হিসাবে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান হিসেবে তাঁর দায়িত্বকাল ছিল ৩ মাস ২৭ দিন বা ১১৯ দিন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশের মহাসড়কগুলোকে চাঁদাবাজি ও হয়রানিমুক্ত করার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন ফারুক আহমেদ। ২২ জুলাই বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আগামী দুই মাসের মধ্যে মহাসড়ক থেকে চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের কোনো সদস্যকে যানবাহন থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের সুযোগ দেওয়া হবে না বলে জানান। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কর্মদক্ষতা বাড়াতে বাহিনীর অভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মহাসড়কে অপরাধ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার ছিল তাঁর দায়িত্বকালের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। অপরাধ ও মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পুরো অংশ এবং ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ককে সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আনার বিষয়টি সামনে আনেন তিনি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের তথ্য জানান। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে মহাসড়ক পর্যবেক্ষণ, ডাকাতি ও মাদক পরিবহনসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধ, দ্রুত পুলিশি সাড়া প্রদান এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য মহাসড়কেও এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা জানান।
মহাসড়কে ডাকাতি প্রতিরোধ ও যানজট নিরসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন তিনি। ২৩ জুলাই হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে জুন ২০২৬ মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় মে ও জুন ২০২৬ এবং জুন ২০২৫ সালের খাতওয়ারি ট্রাফিক অপরাধের তুলনামূলক প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। মহাসড়কের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ দমন, যানজট নিরসন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেন তিনি। আগামী মাসের কর্মপরিকল্পনায় ডাকাতি প্রতিরোধ ও যানজট নিরসনকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেন।
মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতেও উদ্যোগী ছিলেন ফারুক আহমেদ। ৩০ জুলাই হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়ন পরিদর্শন করেন। এ সময় দিনব্যাপী বিভিন্ন সভা ও পরিদর্শন কার্যক্রমে অংশ নেন। দুপুরে কুমিল্লা সার্কিট হাউসের সম্মেলনকক্ষে নিমসার বাজারের যানজট নিরসন বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও জনবহুল এলাকায় যানজট নিরসনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জনসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মহাসড়কে মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। ১০ সেপ্টেম্বর হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে আগস্ট ২০২৬ মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় মহাসড়কে ডাকাতি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ দমন, যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেন। পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব, সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি জনসাধারণের সঙ্গে মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অপরাধ দমনে জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার, মহাসড়কে জানমাল ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন তিনি। ১৫ অক্টোবর সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বর ২০২৬ এবং সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের খাতওয়ারি ট্রাফিক অপরাধের তুলনামূলক প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। মহাসড়কে ডাকাতি প্রতিরোধ, যানজট নিরসন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসাধারণের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেন।
মহাসড়কে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেন তিনি। ৮ অক্টোবর হাইওয়ে পুলিশ সিলেট রিজিয়নের আওতাধীন সিলেট হাইওয়ে সার্কেল অফিস ও শায়েস্তাগঞ্জ হাইওয়ে থানা পরিদর্শন করেন। এ সময় বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। মহাসড়কে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ যান চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যদের আরও দায়িত্বশীল ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। দায়িত্ব পালনে সততা, নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি নিজেদের নৈতিকভাবে পরিশুদ্ধ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। পরিদর্শন শেষে শায়েস্তাগঞ্জ হাইওয়ে থানা প্রাঙ্গণে একটি রামবুটান গাছের চারা রোপণ করেন তিনি।
প্রযুক্তির ব্যবহার, জবাবদিহিতা এবং জনসম্পৃক্ত পুলিশিংয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন ফারুক আহমেদ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে পুলিশি সেবার মান উন্নয়ন, কার্যক্রমে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনসাধারণের আস্থা অর্জন ও মহাসড়কের নিরাপত্তা রক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ১১ জুন প্রতিষ্ঠিত হাইওয়ে পুলিশ দেশের প্রায় ১১ হাজার ৮০৬ কিলোমিটার মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মহাসড়ককেন্দ্রিক অপরাধ প্রতিরোধ, সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব পালন করে। দেশজুড়ে ৭৩টি হাইওয়ে থানা পরিচালনাকারী এ বিশেষায়িত ইউনিটের জনবল ও সম্পদসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
দীর্ঘ পেশাগত জীবনে ফারুক আহমেদ বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৭তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। তিনি ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন), র্যাব সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ছাড়াও পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে কাজ করেছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে লাইবেরিয়া ও সুদানে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ২০২৬ সালের ৪ জুন অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান।
হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্ব পালনকালে তাঁর ঘোষিত অগ্রাধিকার ছিল মহাসড়ককে চাঁদাবাজি ও হয়রানিমুক্ত করা, ডাকাতি-ছিনতাই প্রতিরোধ, যানজট নিরসন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা। দায়িত্বকাল শেষে ৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ৮ নভেম্বর তিনি নতুন কর্মস্থলে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
হাইওয়ে পুলিশের প্রধান হিসেবে ৩ মাস ২৭ দিনের দায়িত্বকালে তাঁর প্রকাশ্যে নথিভুক্ত কার্যক্রমে প্রযুক্তিনির্ভর মহাসড়ক নজরদারি, অপরাধ পর্যালোচনা, চাঁদাবাজি প্রতিরোধের অঙ্গীকার, যানজট নিরসনে আন্তদপ্তর সমন্বয়, মাঠপর্যায়ের থানা ও রিজিয়ন পরিদর্শন এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে হাইওয়ে পুলিশের নেতৃত্বে তাঁর দায়িত্বপর্বের সমাপ্তি ঘটে।














মন্তব্যসমূহ