শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলীয় জাফনার চেম্মানি এলাকায় আবিষ্কৃত একটি গণকবর থেকে শিশু ও নবজাতকসহ ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। খননস্থল থেকে চুড়ি, স্কুলব্যাগ ও শিশুর দুধের বোতলের মতো ব্যক্তিগত সামগ্রীও পাওয়া গেছে। এটি দেশটিতে এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় গণকবরগুলোর একটি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চেম্মানিতে শ্মশান সম্প্রসারণের কাজ করতে গিয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্রমিকরা প্রথম মানবদেহের অবশিষ্টাংশ দেখতে পান। এরপর আদালতের নির্দেশে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও খনন শুরু হয়। তৃতীয় ধাপের খনন শেষে গত আগস্ট পর্যন্ত ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
চেম্মানি এলাকাটি শ্রীলঙ্কার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকে জাফনায় বহু মানুষ নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগের পর থেকেই এলাকাটিতে গণকবর থাকার দাবি উঠেছিল। নতুন আবিষ্কারের পর সেই পুরোনো অভিযোগগুলো আবার আলোচনায় এসেছে।
তবে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষগুলো ঠিক কোন সময়ের এবং তারা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন, তা এখনো ফরেনসিক পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। ফলে কঙ্কালগুলো যুদ্ধকালীন নিখোঁজ ব্যক্তিদের কি না, সেটিও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশন একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
দেহাবশেষগুলো বর্তমানে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মৃত্যুর সম্ভাব্য সময় ও কারণ নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষাও করার কথা জানিয়েছে সরকার। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কার বিচারমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কারা।
গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা আশা করছেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে তারা দ্রুত, স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন।
চেম্মানির সঙ্গে অতীতের একটি আলোচিত মামলারও যোগসূত্র রয়েছে। তামিল স্কুলছাত্রী কৃষান্তি কুমারস্বামীকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দোষী সাব্যস্ত এক সেনাসদস্য ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে দাবি করেছিলেন, ওই এলাকায় শত শত মানুষের মরদেহ সমাহিত করা হয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৯৯ সালেও সেখানে খনন চালানো হয়।
শ্রীলঙ্কার কয়েক দশকের সংঘাতে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী ও তামিল টাইগার উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। যুদ্ধকালীন নিখোঁজদের পরিচয় ও পরিণতি নির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
চেম্মানির বর্তমান তদন্ত নিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকার বলছে, খনন ও ফরেনসিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। বিচারমন্ত্রী জানিয়েছেন, কঙ্কালগুলোর মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের পর ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হবে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে চেম্মানিতে সমাহিত করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হতে হবে বলে জানিয়েছে।
নতুন করে এত বিপুলসংখ্যক দেহাবশেষ পাওয়ায় চেম্মানি এখন শ্রীলঙ্কার যুদ্ধকালীন নিখোঁজদের অনুসন্ধান ও জবাবদিহির প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ তদন্তস্থলে পরিণত হয়েছে। ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার ফলই উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় এবং তাদের মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারে।