সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক রিসোর্টে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দফার শান্তি বৈঠক শেষ হওয়ার পরপরই পরমাণু পরিদর্শন ইস্যুতে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দাবি—ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-র পরিদর্শকদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে—তবে তা সরাসরি নাকচ করেছে তেহরান। সুইজারল্যান্ডে বৈঠক শেষে ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, আইএইএ’র সঙ্গে ইরানের আলোচনা দ্রুতই শুরু হতে পারে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, পরমাণু পরিদর্শন বিষয়ে তেহরান নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
এই বিতর্ক এমন সময়ে সামনে আসে, যখন যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানকে সীমিতভাবে ডলার ব্যবহারের মাধ্যমে তেল বিক্রির সুযোগ দিয়ে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।
মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে দুই দেশ একটি রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে। এই সময়কালে ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের জারি করা ৬০ দিনের জরুরি লাইসেন্স অনুযায়ী, ইরান নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানি করতে পারবে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে।
তবে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, এই শিথিলতার বিনিময়ে ইরানকে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখা এবং আইএইএ’র পরিদর্শকদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সহযোগিতা করতে হবে।
সোমবার সকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেডি ভ্যান্স জানান, পরিদর্শকরা চলতি সপ্তাহেই ইরানে ফিরে যেতে পারেন বলে তারা আশা করছেন। এদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দাবি করেছেন, ইরান বড় ধরনের পরমাণু পরিদর্শন ব্যবস্থায় সম্মত হতে পারে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা’কে বলেন, পরমাণু পরিদর্শন নিয়ে তেহরান নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তিনি স্পষ্ট করেন, জাতিসংঘের পরিদর্শন সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত দেশের পার্লামেন্ট ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের সংঘাতের পর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আইএইএ’র প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে জাতিসংঘ সংস্থাটি তাদের পরিদর্শকদের প্রত্যাহার করে নেয়।
২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রত্যাহারের পর থেকেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক আলোচনায় ট্রাম্পের হুমকিমূলক বক্তব্য নতুন উত্তেজনা তৈরি করে। ভ্যান্স জানান, ওই বক্তব্যের পর ইরানি প্রতিনিধি দল বৈঠক থেকে ওয়াকআউটের হুমকি দিয়েছিল।
সব বিতর্কের মধ্যেও কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে দুই দেশের মধ্যে একটি যোগাযোগ চ্যানেল চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি লেবানন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও লেবাননের মধ্যে একটি সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, এই চুক্তির প্রথম পরীক্ষা হবে লেবানন পরিস্থিতি। বর্তমানে সেখানে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত কিছুটা প্রশমিত হয়েছে।
মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, পরমাণু ইস্যু ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলতা নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য বিশেষ কূটনৈতিক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের পরিকল্পনা চলছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি