শেয়ারবাজারে রেকর্ড গড়া অভিষেকের পর এক মাসের মধ্যেই বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়েছে ইলন মাস্কের মহাকাশ ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিশেষ করে শুরুর দিকে শেয়ার কেনা খুচরা বিনিয়োগকারীরা চাপের মধ্যে পড়েছেন।
গত ১২ জুন নাসডাকে স্পেসএক্সের শেয়ার লেনদেন শুরু হয়। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩৫ মার্কিন ডলার। প্রথম দিনে শেয়ারটি ১৫০ ডলারে লেনদেন শুরু করে এবং বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহে দ্রুত দাম বাড়ে। এ আইপিওর মাধ্যমে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে কোম্পানিটি, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের রেকর্ড।
প্রথম সপ্তাহে স্পেসএক্সের শেয়ারদর ২০০ ডলার ছাড়িয়ে একপর্যায়ে প্রায় ২২৫ ডলারে পৌঁছায়। এতে কোম্পানিটির বাজারমূল্য দুই ট্রিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠে যায় এবং ইলন মাস্কের সম্পদের মূল্যও সাময়িকভাবে এক ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে।
তবে সেই ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে শেয়ারদর প্রায় ১৪৫ ডলারে নেমে এসেছে, যা সর্বোচ্চ দামের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ কম। যদিও এটি এখনো ১৩৫ ডলারের আইপিও মূল্যের চেয়ে কিছুটা বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, স্পেসএক্সের শেয়ার ঘিরে প্রাথমিক উচ্ছ্বাসের বড় একটি কারণ ছিল ইলন মাস্কের জনপ্রিয়তা এবং কোম্পানিটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে প্রবেশ। বছরের শুরুতে মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআইকে অধিগ্রহণ করে স্পেসএক্স। এতে অনেক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু রকেট ও স্যাটেলাইট কোম্পানি নয়, সম্ভাবনাময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দেখতে শুরু করেন।
তবে ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন, স্পেসএক্সের আয়ের প্রধান উৎস এখনো রকেট উৎক্ষেপণ, মহাকাশ পরিবহন এবং স্টারলিংক স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা সম্ভাবনাময় হলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময়, বিপুল বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সাফল্য প্রয়োজন।
স্পেসএক্স গত ৭ জুলাই নাসডাক-১০০ সূচকে যুক্ত হয়। এতে সূচক অনুসরণকারী তহবিলগুলো থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হলেও প্রযুক্তি খাতের সামগ্রিক দুর্বলতার মধ্যে শেয়ারটির দরপতন অব্যাহত থাকে।
বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে স্পেসএক্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বেশ কয়েকটি বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কোম্পানিটির স্টারশিপ, স্টারলিংক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসার সম্ভাবনা বিবেচনায় শেয়ার কেনার পরামর্শ দিয়েছে। তবে অন্যরা উচ্চ বাজারমূল্য, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এরই মধ্যে স্পেসএক্স ৬০ বিলিয়ন ডলারের সম্পূর্ণ শেয়ারভিত্তিক চুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর কোডিং প্ল্যাটফর্ম কার্সরের নির্মাতা অ্যানিস্ফিয়ারকে অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারের উচ্চ মূল্যকে ব্যবহার করে নগদ অর্থ ছাড়াই বড় প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে স্পেসএক্স।
প্রথম দিকে বাজার থেকে উচ্চ দামে শেয়ার কেনা বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে লোকসানে থাকলেও আইপিও মূল্যে শেয়ার পাওয়া ব্যক্তিরা এখনো কিছুটা লাভে রয়েছেন। আগামী আর্থিক প্রতিবেদন এবং কর্মীদের শেয়ার বিক্রির নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হওয়ার পর বাজারে আরও শেয়ার আসতে পারে। ফলে স্পেসএক্সের শেয়ারদরে নতুন করে বড় ওঠানামার আশঙ্কা রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে স্টারশিপের সাফল্য, স্টারলিংকের গ্রাহক বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসা থেকে আয় করার সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে স্পেসএক্স বর্তমান উচ্চ বাজারমূল্য ধরে রাখতে পারবে কি না।
মন্তব্যসমূহ