সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ভারতের তৈরি সুপারসনিক ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ভারতের স্বয়ংক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ‘আকাশতীর’ নিয়েও ভারত ও আমিরাতের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। তবে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক প্রতিরক্ষা বাজারগুলোর একটি। এমন বাজারে ভারতীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রবেশ নয়াদিল্লির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হতে পারে। দীর্ঘদিন অস্ত্র আমদানির ওপর নির্ভরশীল ভারত এখন ধীরে ধীরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চাইছে।
ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ভূমি, সমুদ্র ও আকাশ, তিন মাধ্যম থেকেই নিক্ষেপ করা যায়। শব্দের গতির প্রায় তিন গুণ গতিতে চলতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ বি শিভানে বলেন, আমিরাতের সঙ্গে সম্ভাব্য এই চুক্তি ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য বড় আস্থার বার্তা দেবে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হবে।
তিনি জানান, ব্রহ্মসের পাশাপাশি আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র, পিনাকা রকেট ব্যবস্থা, নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম গোলাবারুদ এবং উপকূলীয় নিরাপত্তায় ব্যবহৃত ড্রোনের প্রতিও সংযুক্ত আরব আমিরাত আগ্রহ দেখিয়েছে।
অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক উদয় চন্দ্রের মতে, আমিরাতের মতো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারকারী দেশের আগ্রহ ভারতীয় অস্ত্রের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়তা করবে। এর প্রভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশও ভারতীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী হতে পারে।
ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আগে থেকেই যৌথ সামরিক মহড়া, সাইবার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। ব্রহ্মস নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনা সেই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার পর উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে আগ্রহী। এ প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক কম রাজনৈতিক শর্ত এবং সাশ্রয়ী মূল্যে ভারতীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি আমিরাতের জন্য আকর্ষণীয় বিকল্প হতে পারে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার সঞ্জয় আইয়ার বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এই আলোচনা আগের অনেক প্রতিরক্ষা সমঝোতার তুলনায় বেশি কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের প্রভাবও বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে ভারতের উপস্থিতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৪ সালে ফিলিপাইনের কাছে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে ভারত। ভিয়েতনামের সঙ্গেও বড় প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় এগিয়েছে দেশটি।
ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে প্রায় ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা ভারতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার যে লক্ষ্য ভারত নিয়েছে, আমিরাতের সঙ্গে সম্ভাব্য এই চুক্তি সেই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে পারে। একই সঙ্গে অস্ত্র আমদানিকারক দেশ থেকে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা রপ্তানিকারক হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ