চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে লরির ধাক্কায় উলটে যাওয়া মিনিবাসের নিচে চাপা পড়ে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) এক ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ছয় দফা দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর জেলা প্রশাসনের আশ্বাসে তাঁরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত শিক্ষার্থীর নাম মাইশা মুশফিরাত। তিনি আইআইইউসির ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাড়ি মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া এলাকায়। সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবার নাম সাখাওয়াত হোসেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে সড়কের পাশে এক সহপাঠীর সঙ্গে লোকাল বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মাইশা।
এ সময় একটি লরিকে অতিক্রম করতে গিয়ে পেছন থেকে আসা আরেকটি লরি ৮ নম্বর রুটের একটি মিনিবাসকে ধাক্কা দেয়।
ধাক্কার পর মিনিবাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উলটে যায়। সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা বাসটির নিচে চাপা পড়েন।
দুর্ঘটনায় মাইশাসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দুর্ঘটনায় রাজিয়া নামের আরেক ছাত্রীসহ তিনজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোস্তফা মুনির চৌধুরী জানান, দুর্ঘটনায় আহত দুই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে মাইশা মারা যান এবং অন্য শিক্ষার্থীকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
মাইশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন।
বেলা ১১টার দিকে তাঁরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। একই সময়ে রেললাইনের ওপর গাছের গুঁড়ি ফেলে ট্রেন চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে পদচারী-সেতু নির্মাণের দাবি জানানো হচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তাঁদের বক্তব্য, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পার হতে হয়।
দুর্ঘটনার প্রতিবাদে ছয় দফা দাবি জানান তাঁরা। এর মধ্যে দ্রুত ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ এবং মহাসড়কে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি ছিল।
শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।
বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার সার্জেন্ট শফিউল ইসলাম শুভ জানান, অবরোধ চলাকালে মহাসড়কের দুই দিকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার যানজট তৈরি হয়।
এতে দূরপাল্লার যানবাহনসহ অসংখ্য গাড়ি আটকা পড়ে। দুর্ভোগে পড়েন হাজারো যাত্রী।
রেলপথেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সীতাকুণ্ড রেলস্টেশনের মাস্টার নিজাম উদ্দিন জানান, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা মহানগর প্রভাতী ট্রেনটি সীতাকুণ্ড স্টেশনে আটকা পড়ে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা মহানগর এক্সপ্রেস ফৌজদারহাট স্টেশনে আটকে যায়।
বিকেল ৪টার পর রেলপথে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে ঘটনাস্থলে যান সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
পরে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম।
তাঁর সঙ্গে ছিলেন পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ শিক্ষকরা।
জেলা প্রশাসক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাশাপাশি নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।
বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মাইশার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজায় জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
জানাজা শেষে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক।
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে দ্রুত ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে লিখিতভাবে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
পাশাপাশি দুর্ঘটনায় জড়িত লরিচালককে গ্রেপ্তার এবং মহাসড়কের দুই পাশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন জেলা প্রশাসক।
প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা ও দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস পাওয়ার পর বিকেল ৪টার দিকে শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক ও রেলপথ থেকে অবরোধ তুলে নেন।
এরপর যানবাহন ও ট্রেন চলাচল শুরু হলেও দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার কারণে মহাসড়কের যানজট স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগে।
এদিকে শিক্ষার্থী মাইশার মৃত্যুতে মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মোহাম্মদ কাসেমের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
মন্তব্যসমূহ