দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে চলমান অস্থিরতার জন্য সরকারের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তকে দায়ী করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল রাখতে মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চলমান মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন, শিল্প রক্ষা এবং মালিক-শ্রমিকদের প্রতি করণীয় তুলে ধরতে জাতীয় শ্রমিক শক্তির আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন হান্নান মাসউদ।
শিল্পাঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরনকে দায়ী করে তিনি বলেন, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা সরকারের অপরিকল্পিত ও অপরিপক্ব সিদ্ধান্তের ফল। সরকারের আশপাশে নিয়োগ পাওয়া উপদেষ্টা ও সহকারীদের পরামর্শও দেশকে এমন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এনসিপির এই নেতা বলেন, পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে সার ও চাল উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের অপরিপক্ব সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে। বারবার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাবে উৎপাদন ও অর্ডার কমার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে হান্নান মাসউদ ২০২৩ সালের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি বলেন, ওই বছর শ্রমিকরা সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা মজুরির দাবি জানিয়েছিলেন। তখন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবিটিকে যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং শেখ হাসিনাকে তা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ বর্তমানে ক্ষমতায় এসে একই দাবিকে অযৌক্তিক বলা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের তুলনায় বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি কয়েক গুণ বেড়েছে। শ্রমিকদের সব দাবি পূরণ না করলেও তাদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাস সিলিন্ডার, অকটেন, চাল, ডাল, তেল, ডিম ও বিদ্যুতের বাড়তি দাম এবং যাতায়াত ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বেতন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
শ্রমিকদের আয় না বাড়লেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের আয় বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে হান্নান মাসউদ বলেন, ‘আপনারা এসব নাটক করেন না। আপনাদের নেতাকর্মীদের তো ইনকাম বেড়েছে, কিন্তু এ দেশের অসহায় সাধারণ শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ, যারা চাঁদাবাজি করে না, তাদের তো ইনকাম বাড়ে নাই।’
শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ সংগঠন ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন তিনি। তার ভাষ্য, আন্দোলনে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা থাকতে পারে, তা তারা অস্বীকার করছেন না। তবে গোয়েন্দা সংস্থা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা কীভাবে অবস্থান করছে, সরকারকে তা খতিয়ে দেখতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তার না করে আন্দোলনে তাদের উপস্থিতির দায় শ্রমিকদের ওপর চাপানো হচ্ছে। শ্রমিকদের পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ ব্যর্থতার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত বলে দাবি জানান।
দেশের পোশাকশিল্পের রপ্তানি আদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়েও কথা বলেন হান্নান মাসউদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গার্মেন্টসের অর্ডার ভিয়েতনাম, ভারত ও মালয়েশিয়ায় চলে যাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। অথচ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের মজুরি কম। মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারতের শ্রমিকরা বাংলাদেশের শ্রমিকদের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেশি বেতন পান।
শ্রমিকদের বেতন বাড়ালে মালিকদের লোকসান হবে—এমন যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বন্দরে ঘুষ বাণিজ্য, পরিবহনে চাঁদাবাজি এবং পথে পথে হয়রানি বন্ধ করা গেলে শিল্পমালিকদের উৎপাদন ব্যয় কমবে। এতে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
শ্রমিকদের আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকা এবং শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপি নেতা। আন্দোলনের মধ্যে মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ রাখা, শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ এবং যুবদল-ছাত্রদলের নেতাদের লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নামার বিষয়ে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া মজুরি কমিশনে শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান হান্নান মাসউদ। শ্রমিকদের ওপর লাঠিচার্জ ও গুলি না চালিয়ে তাদের ন্যায্য দাবি পূরণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই লুটপাটতন্ত্র বন্ধ না করলে এ দেশের প্রত্যেকটা সেক্টরের মানুষ রাস্তায় নামবে, কথা বলবে। ন্যায্য দাবি-দাওয়াকে পাত্তা না দিলে বিপদ আছে।’
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক, রিকশাচালক ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বিরুদ্ধে সরকার অবস্থান নিলে এনসিপি তাদের পাশে দাঁড়াবে। শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘাতের পরিবর্তে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে হান্নান মাসউদ বলেন, ‘আমরা আজকে এখানে কারো পক্ষ হয়ে দাঁড়াই নাই। আমরা বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছি, বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছি।’
মন্তব্যসমূহ