ইয়েমেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মারিব প্রদেশের রাজধানী মারিব সিটির কাছে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশটির সরকারি বাহিনীর তীব্র সংঘাত হয়েছে। ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর দাবি, প্রায় ২৪ ঘণ্টার এই সংঘাতে ৮০ জনের বেশি হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। একই সময়ে হুথিদের নয়টি সামরিক যান ধ্বংস করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে সরকারি বাহিনী।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর মিডিয়া বিভাগের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া আল-হাতেমি সৌদি আরবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আরব নিউজকে এসব তথ্য জানান।
আল-হাতেমি বলেন, শনিবার রাত থেকে রোববার রাত পর্যন্ত প্রায় ২৪ ঘণ্টা মারিবের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে তীব্র লড়াই হয়েছে। এ সময় ৮০ জনের বেশি হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের পর হুথিদের বেশ কয়েকজন যোদ্ধা পিছু হটে পালিয়ে যান এবং তাদের নয়টি সামরিক যান ধ্বংস করা হয়।
ইয়েমেনি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, মারিব প্রদেশের বিভিন্ন সম্মুখসারিতে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলাও চালানো হয়েছে। এসব হামলায় হুথিদের যোদ্ধাদের সমাবেশস্থল, সামরিক রসদ ও শক্তিবর্ধক সরঞ্জাম এবং সুরক্ষিত অবস্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আল-হাতেমির দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় সরকারি বাহিনীর ব্যাপক হামলার মুখে মারিব শহরের বাইরের বিভিন্ন অবস্থান থেকে হুথি যোদ্ধাদের পিছু হটতে হয়েছে।
মারিব ইয়েমেনের যুদ্ধের ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। শহরটিতে ইয়েমেনে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের বড় একটি অংশ বসবাস করে। গত এক দশকের সংঘাত এবং হুথিদের দমন-পীড়ন থেকে পালিয়ে ২০ লাখের বেশি মানুষ মারিবে আশ্রয় নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শহরটির গুরুত্ব শুধু জনসংখ্যার কারণে নয়। মারিবে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের পাশাপাশি একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও রয়েছে। ফলে ইয়েমেনের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মারিব দখলের জন্য হুথিরা অতীতে ধারাবাহিকভাবে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে বহু বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধা নিহত বা আহত হয়েছেন। তবে হুথিদের কোনো অভিযানই শেষ পর্যন্ত মারিব শহর দখলে সফল হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইয়েমেনে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর হুথিরা মারিব দখলের লক্ষ্যে তাদের বড় ধরনের অভিযান বন্ধ করে দেয়। এরপরও ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে শনিবার ইয়েমেনের রাজধানী সানা, আমরান, হোদেইদা এবং হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন অন্যান্য এলাকায় অন্তত ৫০ জন যোদ্ধার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন।
হুথিদের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আরও বড় দাবি করা হয়েছে। আল-হাতেমি বলেন, হুথিরা প্রকাশ্যে যে সংখ্যক নিহতের কথা স্বীকার করে, তা প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতের ১০ শতাংশেরও কম। তার দাবি অনুযায়ী, প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ জন হুথি যোদ্ধা নিহত হচ্ছেন।
হুথিরা নিজেদের প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা গোপন করছে—এমন অভিযোগও করেন আল-হাতেমি। তবে তার দেওয়া দৈনিক হতাহতের এই সংখ্যা এবং হুথিদের ক্ষয়ক্ষতির সামগ্রিক হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হুথিদের সঙ্গে আশপাশের পার্বত্য এলাকায় সংঘর্ষের পর তারা মারিব শহরের পশ্চিমে অবস্থিত নোমান পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে ওই পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে সরকারি বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সংঘাতে উভয় পক্ষের প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এবং সামরিক অবস্থানের পরিবর্তন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত। ফলে ৮০ জনের বেশি হুথি নিহত, নয়টি সামরিক যান ধ্বংস এবং নোমান পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার তথ্যগুলো বর্তমানে মূলত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর দাবি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।