ইয়েমেনের হুথিদের হামলার কারণে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় নিজেদের নৌ অভিযান শক্তিশালী করতে চাইছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু প্রয়োজনীয় যুদ্ধজাহাজ জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে জোটটি। এখন পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম একটি করে অতিরিক্ত জাহাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহপথ সুরক্ষায় ইউরোপের সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আবারও সামনে এসেছে। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যাসপিডিস নৌ অভিযান শুরু করে ইইউ। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় এ অভিযানে অতিরিক্ত নৌ ও আকাশ সক্ষমতা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস জানিয়েছেন, মিশনকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে অন্তত ১০টি যুদ্ধজাহাজ প্রয়োজন। কিন্তু সেই লক্ষ্যে এখনো পৌঁছাতে পারেনি জোট। ইতালির উদ্যোগের পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কাছে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক বিমান দেওয়ার আহ্বান জানান কালাস। লক্ষ্য ছিল বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে ইইউর উপস্থিতি বাড়ানো। কারণ, এই সরু নৌপথটি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনপথের অংশ। এরই মধ্যে নেদারল্যান্ডস একটি ফ্রিগেট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এটি মূল অভিযানের অংশ হিসেবে নয়, সহযোগী ভূমিকায় থেকে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহে কাজ করবে। বেলজিয়ামও তাদের একটি ফ্রিগেট, লিওপোল্ড-১, পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। কিন্তু কারিগরি সমস্যার কারণে জাহাজটি ২০২৭ সালের আগে মিশনে যোগ দিতে নাও পারে।অ্যাসপিডিস মিশনের মূল তিনটি যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করে ইতালি ও গ্রিস। জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামও পালাক্রমে জাহাজ দিয়ে থাকে। ফলে মিশনে সক্রিয় জাহাজের সংখ্যা সবসময় একই থাকে না। বর্তমানে বাড়তি সক্ষমতার প্রয়োজন হলেও সদস্য দেশগুলোর অনেকেই নিজেদের যুদ্ধজাহাজ বাল্টিক ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।এই পরিস্থিতি ইউরোপের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার কারণে বাল্টিক ও কৃষ্ণসাগরেও ইউরোপীয় দেশগুলোর নৌ সক্ষমতার ওপর চাপ রয়েছে। ফলে একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে গিয়ে সদস্য দেশগুলোর সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো মনে করেন, হরমুজ থেকে বাব আল-মান্দেব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া সংকট ইউরোপীয় অর্থনীতি ও নাগরিকদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাই সংকট মোকাবিলায় ইউরোপকে আগের চেয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, ইউরো নিউজের দেখা ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি প্রতিবেদনের গোপন মূল্যায়নে ইউরোপের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় গুরুতর ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব ঘাটতি পূরণ করতে ২০৩০ সালের পর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সব মিলিয়ে, হুথিদের হামলার কারণে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব এখন ইউরোপের বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামরিক প্রস্তুতির ওপরও পড়ছে। আর মাত্র দুটি অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে ইইউকে সামনে আরও বড় সামরিক সক্ষমতার ব্যবস্থা করতে হবে। সূত্র: ইউরো নিউজ