সড়ক নিরাপত্তায় নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প থেকে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তিনি বলেছেন, প্রকল্পের সুপারিশ ও প্রশিক্ষণের ফল মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা না গেলে সেমিনার ও কর্মশালা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) আয়োজিত ‘সড়ক নিরাপত্তা ও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার ও দক্ষতা উন্নয়ন’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শেখ রবিউল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং এতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। তবে প্রকল্প শেষে কী অর্জন হয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতা বাস্তব কাজে কতটা ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ব্যয়ের হিসাব থাকলেও অর্জনের মূল্যায়ন জরুরি। প্রকল্প থেকে পাওয়া শিক্ষা যদি বাস্তবায়ন করা না যায়, তাহলে এর মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে কারণ বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরং দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই সড়ক নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সড়ককে শুধু যান চলাচলের মাধ্যম হিসেবে দেখলে হবে না, এটিকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নির্মাণের শুরু থেকেই নিরাপত্তা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।
সড়ক পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সংস্কারের পরিবর্তে আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের জন্য বিশেষায়িত বিভাগ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন শেখ রবিউল আলম। পাশাপাশি দক্ষ চালক তৈরি, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কারও দায়িত্বহীনতা বা অবহেলার কারণে মানুষের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি জানান, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্রিয়ভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
কর্মশালায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, সড়ক নিরাপত্তা শুধু প্রকৌশলগত বিষয় নয়, এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নও জড়িত। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের সুপারিশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় দরকার। তিনি ক্র্যাশ ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু, নিয়মিত ম্যানুয়াল ব্যবহার এবং কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশে নিরাপদ ও টেকসই সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মশালায় জানানো হয়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান ফান্ড ফর পোভার্টি রিডাকশনের সহায়তায় ২০২২-২০২৬ মেয়াদে সওজের সড়ক নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পের আওতায় সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও ডেটাবেজ তৈরি, রোড সেফটি অডিট এবং সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনায় সওজের সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ করা হয়েছে।
কর্মশালায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, এডিবি, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, পরামর্শক সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।