ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ ১১ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

হাসিনার আশ্রয়: ভারতের পুরনো নীতি এবার নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষায়

হাসিনার আশ্রয়: ভারতের পুরনো নীতি এবার নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষায়
ছবি: সংগৃহীত
ফলো করুন

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন এক কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময় ভারত প্রতিবেশী দেশের নেতাসহ একাধিক ব্যক্তিকে আশ্রয় দিলেও শেখ হাসিনার ঘটনা আগের দৃষ্টান্তগুলোর তুলনায় অনেক বেশি জটিল বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

ভারতের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকটে পড়া ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার নজির রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামার ভারতে আশ্রয় নেওয়া। ১৯৫৯ সালে চীনা শাসনের বিরুদ্ধে তিব্বতের বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ভারতে চলে আসেন। পরে ধর্মশালা তাঁর নির্বাসিত জীবনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তাঁর অবস্থানকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীনের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে সংবেদনশীলতা রয়েছে।

শ্রীলঙ্কার তামিল রাজনীতির নেতা বরদরাজা পেরুমালের ঘটনাও ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯০ সালে শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। ভারত তাঁকে দেশ থেকে বের করে দেয়নি এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে সেখানে থাকার সুযোগ দেয়।

তবে শেখ হাসিনার বিষয়টি এসব ঘটনার তুলনায় ভিন্ন। তিনি বাংলাদেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে তাঁর সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা ছিল।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, গুম, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের সময়ে সংঘটিত ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াও এগিয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে দিল্লির সামনে একদিকে রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি, অন্যদিকে ভারতে অবস্থানরত সাবেক সরকারপ্রধানকে ঘিরে আইনি ও মানবিক প্রশ্ন।

কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে শেখ হাসিনার দিল্লিতে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যের পর। সম্প্রতি তিনি ভারতের রাজধানী থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তাঁর বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি পুনরায় সামনে আনে।

তবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, বেসরকারি একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ওই আয়োজন করেছিল এবং সেখানে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, ভারত সেগুলো অনুমোদন বা সমর্থন করে না।

শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক দিকও রয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার সময় শেখ হাসিনা দেশের বাইরে ছিলেন। পরে তিনি ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটান এবং ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও তৈরি হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতকে তাই একাধিক বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে। শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দিলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আবার তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলে তাঁর নিরাপত্তা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগের মতো বিষয় সামনে আসতে পারে।

ফলে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ের বিষয় হয়ে থাকেনি; এটি এখন দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তাঁকে কতদিন ভারতে রাখা হবে, তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ভারতের অবস্থান কী হবে এবং ভবিষ্যতে প্রত্যর্পণের দাবি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—এসব সিদ্ধান্তই আগামী দিনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্যাগ : ভারত শেখ হাসিনা রাজনৈতিক আশ্রয়

বাংলা ভিউজ

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


হাসিনার আশ্রয়: ভারতের পুরনো নীতি এবার নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষায়

প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন এক কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময় ভারত প্রতিবেশী দেশের নেতাসহ একাধিক ব্যক্তিকে আশ্রয় দিলেও শেখ হাসিনার ঘটনা আগের দৃষ্টান্তগুলোর তুলনায় অনেক বেশি জটিল বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

ভারতের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকটে পড়া ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার নজির রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামার ভারতে আশ্রয় নেওয়া। ১৯৫৯ সালে চীনা শাসনের বিরুদ্ধে তিব্বতের বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ভারতে চলে আসেন। পরে ধর্মশালা তাঁর নির্বাসিত জীবনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তাঁর অবস্থানকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীনের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে সংবেদনশীলতা রয়েছে।

শ্রীলঙ্কার তামিল রাজনীতির নেতা বরদরাজা পেরুমালের ঘটনাও ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯০ সালে শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। ভারত তাঁকে দেশ থেকে বের করে দেয়নি এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে সেখানে থাকার সুযোগ দেয়।

তবে শেখ হাসিনার বিষয়টি এসব ঘটনার তুলনায় ভিন্ন। তিনি বাংলাদেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে তাঁর সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা ছিল।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, গুম, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের সময়ে সংঘটিত ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াও এগিয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে দিল্লির সামনে একদিকে রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি, অন্যদিকে ভারতে অবস্থানরত সাবেক সরকারপ্রধানকে ঘিরে আইনি ও মানবিক প্রশ্ন।

কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে শেখ হাসিনার দিল্লিতে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যের পর। সম্প্রতি তিনি ভারতের রাজধানী থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তাঁর বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি পুনরায় সামনে আনে।

তবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, বেসরকারি একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ওই আয়োজন করেছিল এবং সেখানে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, ভারত সেগুলো অনুমোদন বা সমর্থন করে না।

শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক দিকও রয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার সময় শেখ হাসিনা দেশের বাইরে ছিলেন। পরে তিনি ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটান এবং ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও তৈরি হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতকে তাই একাধিক বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে। শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দিলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আবার তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলে তাঁর নিরাপত্তা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগের মতো বিষয় সামনে আসতে পারে।

ফলে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ের বিষয় হয়ে থাকেনি; এটি এখন দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তাঁকে কতদিন ভারতে রাখা হবে, তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ভারতের অবস্থান কী হবে এবং ভবিষ্যতে প্রত্যর্পণের দাবি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—এসব সিদ্ধান্তই আগামী দিনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ