জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের একটি সম্মেলন কক্ষে বৈঠকটি শুরু হয়। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকের শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এবং সংহতি প্রকাশ করে সহ-আয়োজক হিসেবে পাশে থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের তিনি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সালে এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৮০-এর দশকজুড়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বড় দফার আগমন প্রত্যক্ষ করেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে।
তারেক রহমান বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ একটি বিশাল মানবিক দায়িত্ব বহন করছে। এখনো ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে এখনো মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে, ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে আরেকটি প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা মায়েরা একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তরুণরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে। আর প্রবীণরা নিজেদের ঘরবাড়ি ও গ্রাম ছেড়ে আসার স্মৃতি বুকে নিয়ে সেখানে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিকতার তাগিদে বাংলাদেশ তার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশের শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুরা মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা পাচ্ছে। পাশাপাশি তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
তারেক রহমান বলেন, শিবিরগুলোর পরিস্থিতি উন্নত করতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দীর্ঘ সময় বসবাসের জন্য এসব শিবির কোনো আদর্শ স্থান নয়।
দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে প্রতিদিন ব্যয় বাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর প্রভাব শুধু রোহিঙ্গাদের ওপর নয়, কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ছে। বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ এখন বিপুল।
তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধ ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। একটি দেশে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
তারেক রহমান বলেন, প্রয়োজন বাড়লেও মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পাশে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তবে মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকাল ধরে শুধু বাংলাদেশের ওপর এই দায়িত্ব বহাল রাখাও সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো গভীরভাবে উদ্বেগজনক। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও গুরুতর লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, এখন সহমর্মিতা থেকে সংকটের মূল কারণ ও সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
এ প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথমত, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অন্যান্য রাষ্ট্রকে নিজেদের প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা ফিরে পান।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থাকেও অব্যাহত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান। গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
পঞ্চমত, মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রস্তাব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। বাংলাদেশ চায় তারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজেদের ঘরে ফিরে যাক।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সহায়তা করতে প্রস্তুত থাকবে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প হয়ে না থাকে। বরং এটি যেন ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্পে পরিণত হয় এবং সেই প্রক্রিয়ার সূচনা এখনই হয়।