ঢাকা    রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

স্বাস্থ্য খাতে দালালি ও টেস্ট বাণিজ্য বন্ধে কঠোর হচ্ছে সরকার

স্বাস্থ্য খাতে দালালি ও টেস্ট বাণিজ্য বন্ধে কঠোর হচ্ছে সরকার
ছবি : সংগৃহিত
ফলো করুন

সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের প্রলোভন দেখিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িত দালালচক্রের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় দক্ষতা নিয়ে আয়োজিত এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে। অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

দেশের আটটি বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি তৈরি করা হয়েছে। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, জরিপের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক বাজেট ব্যবহারের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এই হার ছিল সবচেয়ে কম, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অর্থ অব্যয়িত থাকলেও মাত্র ১১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি টেন্ডারে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে অনেক সময় অযৌক্তিক ও কঠিন শর্ত যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সীমিত করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়।

স্বাস্থ্য খাতে অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, অতীতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল ছাড়াই বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যয়বহুল চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। এর ফলে অনেক সরঞ্জাম ব্যবহার না হয়ে পড়ে আছে।

সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেও পাশের বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী পাঠানো, অস্ত্রোপচার করা বা রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা থেকে কমিশন নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে নজরদারি বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে কোনো চিকিৎসক বা কর্মচারী ব্যক্তিগত ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাতে পারবেন না। এসব অনিয়ম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হামের টিকাদান কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হামে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৯৯ শতাংশ টিকা নেয়নি। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি আরও এক লাখের বেশি শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।

ডায়ালাইসিস সেবা নিয়েও নতুন পরিকল্পনার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস মেশিন কিনবে। প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার এবং প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশের ১০টি উপজেলা ও ৯০টি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল, স্মার্টফোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কিট বক্স দেওয়া হবে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওজন, উচ্চতা, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং বিভিন্ন প্রাথমিক রক্ত পরীক্ষা করবেন।

নারী রোগীদের জন্য নারী স্বাস্থ্যকর্মী এবং পুরুষদের জন্য পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী দায়িত্ব পালন করবেন। এর মাধ্যমে স্তন ক্যানসার, জরায়ুমুখের ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।

মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অডিটের নামে ঘুষ না দেওয়ারও নির্দেশ দেন মন্ত্রী। কোনো কর্মকর্তা অনৈতিক অর্থ দাবি করলে বিষয়টি সরাসরি তাকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে আকস্মিক পরিদর্শন বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সন্তানসম্ভবা নারী ও তার পরিবারকে ভয় দেখিয়ে সিজার করানোর অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় লেবার রুম, নবজাতক পরিচর্যার যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া অস্ত্রোপচার পরিচালনা করা কয়েকটি ক্লিনিক ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সিভিল সার্জন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজাসহ স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।

ট্যাগ : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সরকারি হাসপাতাল

বাংলা ভিউজ

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


স্বাস্থ্য খাতে দালালি ও টেস্ট বাণিজ্য বন্ধে কঠোর হচ্ছে সরকার

প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের প্রলোভন দেখিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িত দালালচক্রের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় দক্ষতা নিয়ে আয়োজিত এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে। অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

দেশের আটটি বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি তৈরি করা হয়েছে। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, জরিপের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক বাজেট ব্যবহারের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এই হার ছিল সবচেয়ে কম, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অর্থ অব্যয়িত থাকলেও মাত্র ১১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি টেন্ডারে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে অনেক সময় অযৌক্তিক ও কঠিন শর্ত যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সীমিত করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়।

স্বাস্থ্য খাতে অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, অতীতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল ছাড়াই বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যয়বহুল চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। এর ফলে অনেক সরঞ্জাম ব্যবহার না হয়ে পড়ে আছে।

সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেও পাশের বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী পাঠানো, অস্ত্রোপচার করা বা রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা থেকে কমিশন নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে নজরদারি বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে কোনো চিকিৎসক বা কর্মচারী ব্যক্তিগত ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাতে পারবেন না। এসব অনিয়ম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হামের টিকাদান কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হামে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৯৯ শতাংশ টিকা নেয়নি। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি আরও এক লাখের বেশি শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।

ডায়ালাইসিস সেবা নিয়েও নতুন পরিকল্পনার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস মেশিন কিনবে। প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার এবং প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশের ১০টি উপজেলা ও ৯০টি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল, স্মার্টফোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কিট বক্স দেওয়া হবে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওজন, উচ্চতা, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং বিভিন্ন প্রাথমিক রক্ত পরীক্ষা করবেন।

নারী রোগীদের জন্য নারী স্বাস্থ্যকর্মী এবং পুরুষদের জন্য পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী দায়িত্ব পালন করবেন। এর মাধ্যমে স্তন ক্যানসার, জরায়ুমুখের ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।

মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অডিটের নামে ঘুষ না দেওয়ারও নির্দেশ দেন মন্ত্রী। কোনো কর্মকর্তা অনৈতিক অর্থ দাবি করলে বিষয়টি সরাসরি তাকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে আকস্মিক পরিদর্শন বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সন্তানসম্ভবা নারী ও তার পরিবারকে ভয় দেখিয়ে সিজার করানোর অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় লেবার রুম, নবজাতক পরিচর্যার যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া অস্ত্রোপচার পরিচালনা করা কয়েকটি ক্লিনিক ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সিভিল সার্জন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজাসহ স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ