হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর টোল আদায়ের দাবিতে অনড় অবস্থান থেকে ইরানকে সরাতে পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র ও ওমান। এ লক্ষ্যে পরোক্ষ আলোচনায় ওয়াশিংটনের প্রধান প্রস্তাব ছিল, বিদেশে জব্দ ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের একটি অংশ অবমুক্ত করা হবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত তেহরান সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। বরং ইরানের সামরিক নেতৃত্ব বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার দোহায় যান। সেখানে তাঁরা কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল, গত মাসে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে হওয়া প্রাথমিক সমঝোতার বাস্তবায়ন নিয়ে অচলাবস্থা কাটানো।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামনে একটি বিনিময় প্রস্তাব দিয়েছে। এতে বলা হয়, ইরান যদি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের দাবি ও টোল আদায়ের অবস্থান থেকে সরে আসে, তাহলে দেশটির জব্দ তহবিল থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড় করা হতে পারে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী, বিদেশে জব্দ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের একটি অংশ ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ার কথা ছিল ইরানের। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা দেশটির অর্থনীতির জন্য নতুন বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আলোচনার শুরুতে কাতারে আটকে থাকা ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছিল। তবে ইরানের প্রণালি অবরোধ ও টোল দাবির কারণে সেই প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব তাদের অবস্থান বদলানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
দোহা থেকে ফিরে ইরানের আলোচক ও উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেন, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের নয়, ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন। দিনের শেষভাগে ইরানের সামরিক বাহিনী আরও কঠোর ভাষায় জানায়, ইরানের অনুমোদিত পথ ব্যবহার না করে কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
ইরান হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী প্রতিটি জাহাজের কাছ থেকে নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক সেবার বিনিময়ে ফি আদায় করতে চায়। তেহরানের ধারণা, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে সম্ভাব্য ৪০ বিলিয়ন ডলার আয়ের বড় অংশ পাওয়া সম্ভব। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলো এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর বিকল্প হিসেবে আলোচনায় এসেছে ওমানের একটি প্রস্তাব। হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাংশে ওমানের অধিকার রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সামুদ্রিক সেবার অর্থ সরাসরি টোল হিসেবে নয়, বরং একটি বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। তেল ও জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্বেচ্ছা অনুদানের ভিত্তিতে ওই তহবিলে অর্থ দেবে।
তবে ইরান এখন পর্যন্ত এ পদ্ধতির বিরোধিতা করেছে। কারণ এতে তেহরানের হাতে সরাসরি টোল বা ফি আদায়ের সুযোগ থাকবে না। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও এই পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ইরান নিজের শর্তে প্রণালি খুলতে চায় এবং যে কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে, তা ছাড়তে চায় না। তবে তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে প্রণালি কার্যকরভাবে পরিচালনার চেয়ে সেটিকে অস্থিতিশীল করা ইরানের জন্য সহজ।
চলমান অচলাবস্থার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। পণ্যবাজারের তথ্যদাতা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক জাহাজ চলাচলের সংখ্যা নেমে আসে ৪৩টিতে। এক সপ্তাহ আগেও এ সংখ্যা ছিল ৭৫। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ এই প্রণালি ব্যবহার করত।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস রপ্তানি এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
মন্তব্যসমূহ