পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পারমাণবিক জ্বালানির (ইউরেনিয়াম) নতুন আরও একটি চালান সফলভাবে প্রকল্প এলাকায় এসে পৌঁছেছে। সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা বলয় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে জ্বালানিবাহী বিশেষ লরিবহরটি শুক্রবার (৬ নভেম্বর ২০২৬) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, দ্বিতীয় ইউনিটের প্রাথমিক জ্বালানি ও প্রথম ইউনিটের সম্পূরক জ্বালানি আমদানির অংশ হিসেবে এই দফায় এখন পর্যন্ত মোট ৫টি চালান রূপপুরে পৌঁছাল। এর আগে গত ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ৪টি চালান সুরক্ষিতভাবে প্রকল্প এলাকায় আনা হয়েছিল এবং শুক্রবার সকালে এলো পঞ্চম চালানটি।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের প্রাথমিক জ্বালানির জন্য ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি এবং প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত বা রিফুয়েলিংয়ের জন্য ৪৮টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলিসহ মোট ২১১টি অ্যাসেম্বলি বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। এই জ্বালানি মোট ৯টি আলাদা চালানে রাশিয়া থেকে বিশেষ বিমানে ঢাকায় এনে সড়কপথে রূপপুরে আনা হচ্ছে। বাকি ৪টি চালান আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই ধাপে ধাপে প্রকল্প এলাকায় এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই সফলতার সাথে শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ) কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর অক্টোবর মাসের শেষভাগে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভৌত ও তাপীয় পরীক্ষার সূচনা করা হয়।
সব কারিগরি প্রস্তুতি সফল থাকলে আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে যুক্ত হতে পারে বলে নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ৫ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে (ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে বা তার আগেই) রূপপুর থেকে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট প্রায় ২০ শতাংশ তাপীয় ক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। এই মাত্রা পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে যখন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হবে, তখন রিঅ্যাক্টর থেকে উৎপাদিত বাষ্প দিয়ে মূল টারবাইন ঘোরানো হবে এবং টারবাইনের সাথে যুক্ত জেনারেটর চালু হয়ে বাণিজ্যিকভাবে রূপান্তরের প্রাথমিক বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, চুল্লির অভ্যন্তরীণ চাপ ও স্থায়িত্ব সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হবে। প্রথম ইউনিটটি পুরোপুরি চালু হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে এর পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী ১,১০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর। তাই এক ধাপ থেকে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে শতভাগ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কারিগরি মান কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। কোনো ধরনের সূক্ষ্ম কারিগরি ত্রুটি বা প্রেসার ভাল্ব পরীক্ষায় সামান্যতম বিচ্যুতি লক্ষ্য করা গেলে সন্তোষজনক সমাধান না আসা পর্যন্ত প্রতিটি যন্ত্রাংশ বারবার পরীক্ষা ও পরিমার্জন করা হচ্ছে। রূপপুরের দুটি ইউনিটই পুরোদমে উৎপাদনে এলে জাতীয় গ্রিডে সার্বক্ষণিকভাবে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন ও পরিবেশবান্ধব কার্বন-মুক্ত বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও শিল্পায়নে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটাবে।














মন্তব্যসমূহ