বাংলাদেশে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল এবং সরকার পরিবর্তনের একাধিক অধ্যায় রচিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সহিংসতা এখনো বন্ধ হয়নি। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সংঘাত, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রাণহানির এই ধারাবাহিকতা বিভিন্ন সরকারের আমলেই অব্যাহত রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের পাইস্কায় গত ১৮ অক্টোবর যুবদল নেতা রিপন মিয়াকে কুপিয়ে হত্যা কিংবা চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের সংঘর্ষে দুই ভাইয়ের নিহতের ঘটনা মূলত এই দীর্ঘ সহিংসতারই অংশ। স্থানীয় বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় কার নাম থাকবে, সেই বিরোধ থেকেই নারায়ণগঞ্জের হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। চুয়াডাঙ্গায় ইফতারের পর কথা-কাটাকাটি থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে নিহত হন হাফিজুর রহমান ও তাঁর ভাই জামায়াত নেতা মফিজুর রহমান।
আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৬৭টি ঘটনায় ৯৪ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৫৮৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির দুই পক্ষের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনাই ছিল ১১২টি, যাতে ১৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ২১৫ জন আহত হন। এই পরিসংখ্যানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের পাশাপাশি নির্বাচিত সরকারের আমলের চিত্রও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাতকে শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের ২০১৪ সালের ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় উদ্ধৃত আসকের তথ্যে দেখা যায়, ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির অভ্যন্তরীণ ২৮৪টি সংঘর্ষে ৫৫ জন এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৭ জন নিহত হন। একই সময়ে চারদলীয় জোটে একসঙ্গে সরকারে থাকলেও বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৩৪টি সংঘর্ষে ৮ জন প্রাণ হারান।
২০০৭ ও ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জরুরি অবস্থার কারণে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বিধিনিষেধ থাকায় প্রকাশ্য সংঘর্ষ কমলেও সে সময় নির্বিচার গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে দলটির অভ্যন্তরীণ ৭৯৯টি সংঘর্ষে ৯৭ জন নিহত হন। ২০১৩ সালের বিতর্কিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতায় রেকর্ড ৫০৭ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে জামায়াত-শিবির ও পুলিশের মধ্যকার সংঘর্ষেই প্রাণ হারান বহু মানুষ। এ ছাড়া ২০১৬ ও ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে যথাক্রমে ১৪৭ ও ১১৩ জনের মৃত্যু প্রমাণ করে যে স্থানীয় পর্যায়ে পদ ও ক্ষমতা ভাগাভাগি সবসময়ই সহিংসতার অন্যতম বড় কারণ।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার, ঠিকাদারি কাজ, পরিবহন, হাটবাজার, জমি দখল ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বই সহিংসতার মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলন দমনে সাবেক সরকার ও তাদের সহযোগী বাহিনীর সহিংসতায় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা তৈরি হলেও স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ এক হাত থেকে অন্য হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকে। চট্টগ্রামে ব্যবসা ও কৃত্রিম টার্ফ মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে যুবদল কর্মী নিহতের মতো ঘটনাও ঘটে। ২০২৫ সালে বিএনপির অভ্যন্তরীণ ১৯২টি সংঘর্ষে ৪০ জন এবং যুবদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আরও ৮ জন প্রাণ হারান।
এমনকি ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) এই সহিংসতার বাইরে থাকতে পারেনি। দলটির সংশ্লিষ্টতায় ২০২৫ সালে ৯টি ঘটনায় ৫ জন এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৯টি সংঘর্ষে ২২০ জন আহত হন, যার অধিকাংশই ঘটেছিল বিএনপির সঙ্গে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৩৭টি সংঘর্ষের ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ১ হাজার ৫৪ জন আহত হয়েছেন।
বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিএনপি সরকারের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পূর্ণ দায় বর্তেছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং সংসদ সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেছেন। পুলিশও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছে। তবে মাঠপর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে কঠোর আইনি পদক্ষেপের চেয়ে কেবল দলীয় বহিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
২০০৯ সালে সাউথ এশিয়ান সার্ভে সাময়িকীতে প্রকাশিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এম. মনিরুজ্জামানের গবেষণা অনুযায়ী, এই সহিংসতা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শত্রুতা বাড়িয়ে সমঝোতার পথ রুদ্ধ করে দেয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পেশিশক্তিকে রাজনৈতিক চর্চার স্বাভাবিক হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সরকার বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হলেও স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ক্ষমতা বণ্টন প্রক্রিয়ার কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এই সহিংসতার চক্র থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।














মন্তব্যসমূহ