সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে বহুল আলোচিত ত্রিপক্ষীয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ অনুমোদন করেছে তুরস্কের পার্লামেন্ট। ন্যাটোর (NATO) যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর আদলে তৈরি এ চুক্তির আওতায় স্বাক্ষরকারী কোনো সদস্যদেশ বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলোকে তার পাশে সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ, জোটভুক্ত যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সদস্যদেশগুলোর সামগ্রিক নিরাপত্তার ওপর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) তুরস্কের গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে (পার্লামেন্ট) ভোটাভুটির মাধ্যমে চুক্তিটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। কাতারভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, এমন এক সময়ে এই ঐতিহাসিক অনুমোদন এল, যখন ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে তীব্র নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে সৌদি আরব।
এর আগে গত আগস্টে তুরস্ক প্রথমবারের মতো এই যৌথ প্রতিরক্ষা নথিতে স্বাক্ষর করে এবং পরবর্তীতে তা আইনি অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হয়। পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার জেলাল আদানের উপস্থিতিতে বিলটির ওপর গভীর বিতর্ক শেষে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে ৩৯৮ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। এর মধ্যে ২৭৯ জন আইনপ্রণেতা চুক্তির পক্ষে ভোট দেন এবং বিপক্ষে ভোট পড়ে ১১৯টি।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা ১৬টি অনুচ্ছেদ সংবলিত চুক্তিটির প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—কোনো সদস্যদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর সরাসরি হুমকি দেখা দিলে তা প্রতিহত করতে অন্য দেশগুলো ‘প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা’ গ্রহণ করবে। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে এর পরিধি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোনো সদস্যদেশ একক বা একাধিক দেশের সশস্ত্র আগ্রাসনের শিকার হলে বাকি দেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে আক্রান্ত দেশকে সামরিক, লজিস্টিক ও কৌশলগত সহায়তা দেবে। এ ধারাটি ন্যাটোর ঐতিহাসিক ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের (Article 5) সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে তুরস্ক একই সাথে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি এবং এই নতুন মুসলিম প্রতিরক্ষা বলয়ের অংশ হওয়ায় ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কিছু বিশ্লেষক। আঙ্কারা অবশ্য এই আশঙ্কাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন উল্লেখ করে জানিয়েছে, এটি কেবল একটি আঞ্চলিক আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা। চুক্তির শর্তানুযায়ী, প্রাথমিক মেয়াদ হবে ১০ বছর এবং পরবর্তীতে নতুন সদস্য যুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে সিরিয়ার সরকারও এই প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
পার্লামেন্টে চুক্তিটি পাস হলেও এর ফলে সৌদি আরবে অবিলম্বে তুর্কি সেনা মোতায়েন হচ্ছে না। তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের স্পষ্ট করেছেন, আঙ্কারা হুথিদের সাথে সরাসরি কোনো সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়; বরং রিয়াদের অভ্যন্তরীণ আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করাই হবে তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। সাম্প্রতিক সময়ে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বৃহস্পতিবার মদিনা অঞ্চলে হুথিদের ড্রোন হামলার দাবির মুখে এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সামরিক ভারসাম্যে একটি বড় ধরনের নতুন মেরুকরণ তৈরি করল।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি














মন্তব্যসমূহ