বিলুপ্তপ্রায় লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনতে আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন করতে যাচ্ছে সরকার। রবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্য, আঞ্চলিক লোকসংগীত ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের পাশাপাশি এতে যুক্ত হবে আধুনিক ব্যান্ড সংগীতও।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদিন পার্কের বৈশাখী মঞ্চে এ তথ্য জানান সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে আয়োজিত দুদিনব্যাপী লোকজ সাংস্কৃতিক মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সামনে আনাই দেশব্যাপী উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য। ভাটিয়ালি, জারি, সারি, বাউল ও অন্যান্য লোকসংগীতের পাশাপাশি পিঠা উৎসব এবং ঘুড়ি ওড়ানোর মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনও এতে স্থান পাবে। নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়াতে রাখা হচ্ছে ব্যান্ড সংগীতের পরিবেশনাও।
আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের মতে, গ্রাম ও শহরের অনেক সাংস্কৃতিক ধারা অবহেলা এবং চর্চার অভাবে হারিয়ে যাওয়ার পথে। এসব ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রাণ ফেরানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
দেশের সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সংস্কৃতি একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ি ও সমতল উভয় এলাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণে ধারাবাহিক পরিচর্যার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। যথাযথ সহযোগিতা না থাকায় সংগীত, নৃত্য, কবিতা ও লোকজ সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখা প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হচ্ছে না।
তিনি বিষয়টি বোঝাতে বলেন, পর্যাপ্ত সার, পানি ও সুরক্ষা ছাড়া যেমন একটি চারাগাছ বেড়ে উঠতে পারে না, তেমনি প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সংস্কৃতির বিকাশও সম্ভব নয়।
সংস্কৃতি খাতের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, অন্যান্য খাতের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।
এদিকে, জাতীয় পর্যায়ে ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের আয়োজন ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। চলতি নভেম্বরের শেষ দিকে জাতীয় পর্যায়ের মূল কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে ২০২৭ সালের মে মাস পর্যন্ত বিভিন্ন আয়োজন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নতুন প্রজন্মকে দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, যাত্রা, সার্কাস ও শিল্পকলার মতো ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমগুলোকে সুস্থ ও রুচিশীলভাবে চর্চার সুযোগ দিতে হবে। দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তরুণদের পরিচয় ও সম্পৃক্ততা বাড়লে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আরও শক্তিশালী হবে।
ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এ অঞ্চলের সংস্কৃতিচর্চার ইতিহাস সমৃদ্ধ। স্থানীয় তরুণদের পরিবেশনাও প্রশংসার দাবি রাখে। তবে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও সক্রিয় করা প্রয়োজন।
সংস্কৃতির পুনর্জাগরণে কেবল সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের আলোচনা পর্ব শেষে সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেন প্রখ্যাত লোকশিল্পী কুদ্দুস বয়াতি। এ ছাড়া পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘গুরু-শিষ্য’ পালাগান।
মন্তব্যসমূহ