দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলাম চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। একই সঙ্গে শিক্ষাক্রম, শিক্ষক, বিদ্যালয় তদারকি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি—এই পাঁচটি ক্ষেত্রে সমন্বিত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত ‘ফ্রম দ্য ফিল্ড টু রিফর্ম : অ্যাডভান্সিং প্রাইমারি এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে কেবল একটি খাতের সংস্কার যথেষ্ট নয়। শিক্ষাক্রমের পাশাপাশি শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, তদারকি, বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং প্রযুক্তির ব্যবহারেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা সম্ভব হবে না।
ববি হাজ্জাজ জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেই লক্ষ্য অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন শিক্ষাক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৮ সালে তা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিখনফলকে গুরুত্ব দিয়ে শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে বাংলা, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি খেলনাভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ব্যবহারিক শিখন কার্যক্রমের মাধ্যমে পাঠদান আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তা, মনিটরিং কর্মকর্তা ও প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে ৬০ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়েছে।
এসব আলোচনায় তিন হাজারের বেশি অংশীজনের মতামত ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মনিটরিং কর্মকর্তা এবং দেড় হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক রয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রীর মতে, মাঠপর্যায়ের এসব মতামত প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা চিহ্নিত করা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে সহায়ক হয়েছে।
শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেন ববি হাজ্জাজ। তিনি জানান, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক্-চাকরি প্রশিক্ষণ, পদায়ন, পেশাগত উন্নয়ন ও মূল্যায়নকে সমন্বিত করে একটি শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।
শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
একই সঙ্গে শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন পৃথকভাবে পরিচালনা এবং উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দেন প্রতিমন্ত্রী।
বিদ্যালয় তদারকি ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে জনবলের ঘাটতি ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজের চাপ কমানো জরুরি। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করে তদারকি কার্যক্রমকে ফলপ্রসূ করতে হবে।
এ লক্ষ্যে ১১ ধাপের বিদ্যালয় পরিদর্শন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বিদ্যালয় পরিদর্শনের উদ্দেশ্য শুধু প্রতিবেদন তৈরি করা নয়। শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, যথাযথ পাঠদান এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে কতটা শিখছে, তা নিশ্চিত করাই তদারকির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও শিশুর প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
ববি হাজ্জাজ বলেন, শুধু নতুন ভবন নির্মাণ করলেই মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে না। শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শৌচাগার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা শিশুদের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষ করে নদীভাঙনপ্রবণ ও পাহাড়ি এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপদ ও শিশুবান্ধব বিদ্যালয় পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। এতে শিক্ষকদের কাজ সহজ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিখনফল উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।
জাতীয় সংলাপে অংশীজনদের কাছ থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী।
মন্তব্যসমূহ