টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকশিল্পের বর্জ্য পানি শোধনে চালের তুষ ও তুষের গুঁড়ার মতো দেশীয় প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। প্রচলিত ব্যয়বহুল রাসায়নিকের বিকল্প হিসেবে এসব উপাদান কাজে লাগানো গেলে বর্জ্য পানি শোধনের খরচ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হতে পারে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সচিবালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে টেক্সটাইল শিল্পের বর্জ্য পানি শোধনবিষয়ক গবেষণা আলোচনা সভায় এসব তথ্য উঠে আসে।
সভায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকশিল্পের বর্জ্য পানি পরিবেশসম্মত উপায়ে শোধন এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) ও শিল্পমালিকদের যৌথ গবেষণার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, টেকসই শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে বিসিএসআইআরের সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর টেকসই উন্নয়ন বিভাগকে সমন্বিতভাবে গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করতে হবে।
শিল্পকারখানা থেকে বর্জ্য পানি নির্গমনের আগেই কার্যকর শোধন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন সচিব। এ জন্য দক্ষ গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
আনোয়ার হোসেন বলেন, টেক্সটাইল শিল্পে রাসায়নিক রঙের ব্যবহার কমিয়ে স্থানীয়ভাবে পাওয়া প্রাকৃতিক উপাদানের প্রয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব।
বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে রং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। এ লক্ষ্যে দেশের রাসায়নিক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পরামর্শ দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব।
টেক্সটাইল শিল্পে রং করার প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ ও সুপেয় পানি ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
সচিব বলেন, পানি ব্যবহারের পরিমাণ কমাতে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে রং করার পর ব্যবহৃত পানি এবং শোধিত বর্জ্য পানি পুনর্ব্যবহারের কার্যকর পদ্ধতি খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
সভায় গবেষক সাবরিনা মোস্তফা টেক্সটাইল শিল্পের বর্জ্য পানি থেকে ক্ষতিকর রং অপসারণের একটি গবেষণা উদ্যোগ তুলে ধরেন।
তিনি জানান, প্রচলিত ব্যয়বহুল রাসায়নিকের বিকল্প হিসেবে চালের তুষ ও তুষের গুঁড়ার মতো স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপাদান ব্যবহারের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
গবেষণার লক্ষ্য হলো বর্জ্য পানি শোধনের এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করা, যা তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব হতে পারে।
এ প্রযুক্তি শিল্পকারখানায় প্রয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করতে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়েও আলোচনা হয়।
অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ ইনোভেশন সেন্টারের মাধ্যমে ড. নওশাদ হকের কারিগরি ও গবেষণা সহযোগিতায় পরীক্ষামূলক প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া থেকে ভার্চ্যুয়ালি সভায় যুক্ত হয়ে ড. নওশাদ হক বলেন, স্থানীয় প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে কম খরচে বর্জ্য পানি থেকে রং অপসারণের প্রযুক্তি বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তাঁর মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি শিল্পকে আরও পরিবেশবান্ধব করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
আলোচনায় বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গবেষণাটিকে সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, টেক্সটাইল শিল্পে এ প্রযুক্তির দ্রুত পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করতে বিকেএমইএ প্রস্তুত রয়েছে।
সভায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. সৈয়দা নওশিন পর্ণিনী, বিসিএসআইআরের চেয়ারম্যান ড. সামিনা আহমেদ, বিজিএমইএর প্রতিনিধি এবং এইচঅ্যান্ডএমের টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্যসমূহ