মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর সঙ্গে বিশেষ ধরনের উভচর হামলা বা অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট ইউনিটও রয়েছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। নতুন স্ট্রাইক গ্রুপে নাবিক ও মেরিন মিলিয়ে প্রায় ৯ হাজার সদস্য রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মোতায়েনের মধ্য দিয়ে ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের যুদ্ধের পরিস্থিতি কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মিডটার্ম নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও বাড়ানো একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে এখনো বিবেচনায় রয়েছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি বলেছিলেন, এটি মাত্র কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এখন যে জাহাজগুলোর বহর যাচ্ছে, সেগুলোতে সম্মিলিতভাবে সাত হাজারের বেশি নাবিক এবং দুই হাজার মেরিন রয়েছে। এই বহরের মধ্যে রয়েছে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ এবং ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ড অ্যাম্ফিবিয়াস রেডিনেস গ্রুপ। মাকিন আইল্যান্ডের সঙ্গে রয়েছে দুটি উভচর অবতরণকারী জাহাজ।
এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এর ফলে অক্টোবরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে একসঙ্গে তিনটি বিমানবাহী রণতরি থাকতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইতিমধ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক সদস্যদের সঙ্গে এই নতুন মোতায়েন যোগ হলে, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি বেড়ে ২০ হাজারের বেশি নাবিক ও মেরিন এবং শত শত সামরিক বিমানে দাঁড়াতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রাচ্যে একসঙ্গে তিনটি বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করেছিল মার্কিন নৌবাহিনী। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালের পর সেটিই ছিল প্রথমবার। বর্তমানে এই অঞ্চলে রয়েছে ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন বিমানবাহী রণতরি। এর পাশাপাশি রয়েছে ইউএসএস বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডিনেস গ্রুপ।
সাধারণত ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন থাকে। তবে এবার এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের জায়গা নিতে। আব্রাহাম লিঙ্কনের আগের মোতায়েন অত্যন্ত কঠিন ছিল। এর ফলে জাহাজটির নাবিকদের টানা ২৬০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রে থাকতে হয়েছিল।
থিওডোর রুজভেল্টের বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর পর জর্জ ওয়াশিংটনকে আবার জাপানের আশপাশের সমুদ্রে পাঠানো হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেন। তিনি বলেন, ৩ নভেম্বরের মিডটার্ম নির্বাচনের পর ইরানে বোমা হামলা আরও বাড়ানো ‘সম্ভব’।
এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, তাঁর কৌশল সম্পর্কে তিনি এখন আর বিস্তারিত কিছু বলতে পারবেন না। তিনি বলেন, ‘আমি সেটা বলতে পারি না। কারণ দেখুন, আপনি তো জানতে চাইছেন, কোথায় বোমা ফেলবেন?’
সোমবার নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘যে বিষয়গুলো এক বছর আগে আমি অনুমোদন করতাম না, আজও সেগুলো অনুমোদন করব না।’
উদাহরণ হিসেবে ট্রাম্প ইরানের এমন একটি প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ইরান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি ‘খুলে দেওয়ার’ প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ট্রাম্প বলেন, পুরো প্রস্তাবটিই ‘যথেষ্ট ভালো ছিল না’।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহনে এই সমুদ্রপথের বড় ভূমিকা রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের কারণে নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কি না, ট্রাম্পকে সে বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়। প্রথমে ট্রাম্প উত্তর দেন, ‘এটা সম্ভব।’ তবে এরপর তিনি যোগ করেন, ‘এটা বরং সাহায্য করা উচিত, কারণ ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে ১০০ শতাংশ মানুষই’ ইরানের হাতে পারমাণবিক হামলার সক্ষমতা থাকা উচিত নয় বলে মনে করে। এরপর তিনি বলেন, ‘তাই আপনি যদি বিষয়টিকে এভাবে বলেন, তাহলে এটি সাহায্য করবে। কিন্তু আপনি যদি সেটা না বলেন, তাহলে এটি ক্ষতি করতে পারে।’
নতুন মার্কিন সামরিক মোতায়েন এবং ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে নতুন মোতায়েনের উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পরিধি সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মন্তব্যসমূহ