ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে ইরান-সমর্থিত আনসারুল্লাহ বা হুথি বাহিনীর সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতি লোহিত সাগর অঞ্চলে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে কোণঠাসা করতে এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালী ও ঐতিহাসিক বন্দরনগরী মোখার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ইরান ও দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হুথিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা দিচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসির উপদেষ্টারা হুথিদের শীর্ষস্থানীয় কমান্ডারদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছেন। তারা উপগ্রহ থেকে সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং সম্মুখ সমরে দিকনির্দেশনা দেওয়ার কাজে সহায়তা করছেন। একই সঙ্গে তেহরান থেকে হুথিদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে।
সম্প্রতি একটি ইরানি যাত্রীবাহী বিমান ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অবতরণের চেষ্টা করলে সৌদি নেতৃত্বাধীন সরকারের বোমাবর্ষণের কারণে সেটি সেখানে অবতরণ করতে পারেনি। পরে বিমানটি হুদায়দাহে অবতরণ করে। ইরান সরকার দাবি করেছে, বিমানটিতে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে যাওয়া একটি হুথি প্রতিনিধিদল এবং ইরানে চিকিৎসা নেওয়া ইয়েমেনি নাগরিকরা ছিলেন। তবে প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কিছু বিশ্লেষকের মতে, এ ধরনের ফ্লাইট সামরিক ও কৌশলগত সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে হুথিরা মোখা, ধুবাব এবং মায়্যুন বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগর থেকে এডেন উপসাগরের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের বিস্তীর্ণ অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের লোহিত সাগরে পৌঁছানোর পথও সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের একটি ফাঁস হওয়া গোপন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আইআরজিসি, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় হুথিরা একটি স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে শক্তিশালী ও সংগঠিত সামরিক বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিক পরামর্শ ও অস্ত্র সহায়তার পাশাপাশি হুথিদের সামরিক সাফল্যের পেছনে তাদের বড় জনবল এবং নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও ভূমিকা রয়েছে। প্রতিবেদনে হুথিদের যোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৭৬ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে ইয়েমেনি সরকার ও তাদের অনুগত বাহিনী পর্বতঘেরা তাইজ ও লাহিজ অঞ্চলে অবস্থান নিয়েছে। কাহবুব পার্বত্য এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষ সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থান এবং কৌশলগত উচ্চতা ধরে রাখার কারণে সরকারি বাহিনী সেখানে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। ফলে হুথিদের প্রাথমিক পর্যায়ের মতো দ্রুত অগ্রগতি বর্তমানে অনেকটাই ধীর হয়ে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইয়েমেনি সরকারের পরাজয় ও সমন্বয়হীনতার পেছনে জোটভুক্ত বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ, কমান্ড সেন্টারের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা লঙ্ঘন এবং সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বিমান সহায়তার ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথিরা বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পরিকল্পনা অস্বীকার করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিমান ও ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা তারা দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে সংকট এড়াতে মার্কিন প্রশাসন হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আন্তর্জাতিক নৌ-যোগাযোগে বিঘ্ন না ঘটানোর বিষয়ে হুথিদের কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়া গেছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
পরিস্থিতির মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। সৌদি আরবকে অতিরিক্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়া অথবা বিমান হামলার মাধ্যমে সমর্থন করার বিষয়ে ওয়াশিংটন দ্বিধায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ইরান সরকার কৌশলগতভাবে হুথিদের একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে বিভিন্ন বিশ্লেষকের মতে, হুথি ও ইরানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং কৌশলগত সমন্বয় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে দুটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। একটি হলো হুথিদের বর্তমান ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ মেনে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো। অন্যটি হলো গত এক দশক ধরে এড়িয়ে চলা দীর্ঘমেয়াদি স্থলযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হলে এর প্রভাব শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌ-যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক পরিবহনের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
মন্তব্যসমূহ