ঢাকা    শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ১৮০ দিনের সময়সীমা ‘নির্দেশনামূলক’: হাইকোর্ট

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ১৮০ দিনের সময়সীমা ‘নির্দেশনামূলক’: হাইকোর্ট
ছবি : সংগৃহীত
ফলো করুন

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে সেই কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক। ফলে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে আইনগত বাধা তৈরি হবে না।

‘মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এই সিদ্ধান্ত দেন হাইকোর্ট। ইডেন কলেজের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের এবং বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৩ সালের ৭ জুন এই রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত সময়ে কোনো মামলার বিচার শেষ করতে ব্যর্থ হলেও এ কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার বিধান নেই। ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার যে সময়সীমা আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বাধ্যতামূলক নয়; বরং নির্দেশনামূলক।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে বিচারিক কার্যক্রম বাতিল বা স্থগিত হয়ে যাবে—এমন কোনো আইনগত পরিণতির কথা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা হয়নি। তাই শুধু নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে কোনো মামলার বিচার বন্ধ হয়ে যাবে না।

প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, কলেজে যাওয়া-আসার সূত্রে আসামি মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলের সঙ্গে ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ২০ বছর বয়সী এক ছাত্রীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০০৭ সালের ৮ জুলাই পাভেলের সঙ্গে একটি বাসায় যাওয়ার পর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। পরবর্তীতে পাভেল ওই শিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণ করলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয়—এমন অভিযোগও মামলায় করা হয়।

ঘটনার পর ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগীর মা। তদন্ত শেষে পুলিশ মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার ১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই ট্রাইব্যুনাল পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

এরপর ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্টে রিট করেন পাভেল। তার দাবি ছিল, মামলাটির নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে গ্রহণ করা হলেও আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ধারায় মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

পাভেলের আবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই মামলাটির নথি ট্রাইব্যুনালে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারির ৩৪ নম্বর আদেশ থেকেও দেখা যায়, ওই সময় মামলাটি এখনো বিচারাধীন ছিল। তার দাবি ছিল, এতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩১ক ধারার বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে।

এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে ৩১ক ধারার বিধান অনুযায়ী বিচার শেষ না হওয়ার কারণ উল্লেখ করে ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল, পাবলিক প্রসিকিউটর এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি বলেও রিটে দাবি করেন পাভেল।

তার যুক্তি ছিল, আইনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হওয়ায় বিচারিক কার্যক্রম আর চলতে পারে না। এ কারণে তিনি বিচার স্থগিতের আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম প্রথমে তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং পরবর্তীতে সেই স্থগিতাদেশ বিভিন্ন সময়ে বাড়ানো হয়।

পরে মামলার উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে হাইকোর্ট রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন।

রায়ে আদালত আরও বলেন, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকার যে দাবি করা হয়েছে, তার সঙ্গে রিটকারীর উপস্থাপিত তথ্য পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রিটকারী পাভেল ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের পরবর্তী কয়েকটি আদেশ গোপন করেছেন। আদালত এটিকে রিটকারীর অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ বলে মনে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

হাইকোর্ট বলেন, মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার পক্ষে যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে, তা রিটকারীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নয়। কারণ এ ক্ষেত্রে রিটকারীর পক্ষে কোনো আইনগত অধিকার সৃষ্টি হয়নি।

সার্বিক তথ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট রুলে কোনো সারবত্তা খুঁজে পাননি। ফলে রুলটি খারিজ করে আদালত আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিলের নির্দেশ দেন।

এই রায়ের ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কোনো মামলায় ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলেও শুধু সেই কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ, স্থগিত বা বাতিল হবে না—এ বিষয়টি স্পষ্ট হলো।

ট্যাগ : নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন মো. সাইফুল ইসলাম পাভেল হাইকোর্টের রায়

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

আরও পড়ুন

আইন ও অপরাধ

নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সদস্যকে ডেকে নিয়ে হাত-পা ভাঙল দুর্বৃত্তরা, কাটল পায়ের রগ

বগুড়ায় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামি ছিনতাই, পিকআপ ভাঙচুর

বিশ্বনাথকে স্ট্রাইকার বানিয়েও প্রথমার্ধে গোল পেল না বাংলাদেশ

আত্মসমর্পণ করে ৫০০ টাকা মুচলেকায় জামিন পেলেন পরীমনি

কর্তব্যরত অবস্থায় আহত পুলিশ সদস্যকে দেখতে হাসপাতালে ডিএমপি কমিশনার

রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৫-এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেন ডিআইজি, তদন্তে দ্রুত আসামি গ্রেপ্তারের নির্দেশ

কথা

এতক্ষণ পর্যন্ত আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কথা বলার সময় আমি সবসময় 'ইনশাআল্লাহ' বলতাম। কিন্তু আজ, এই রাতে আমরা সেই 'ইনশাআল্লাহ'কে …

আবদুল এল-সাইয়েদযুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সেনেটর

মাদরাসাগুলোতে জঘন্য অনাচারের যত ঘটনা শোনা যায়, তার অধিকাংশই ভুঁইফোঁড়, মানহীন প্রাইভেট মাদরাসা।

শায়খ আহমাদুল্লাহইসলামিক স্কলার

আজ সারা দেশে যে জেন-জি আন্দোলন দেখছি, তার সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশে। আমাদের পথ দেখানো এবং তরুণদের প্রতি সংহতি ও সমর্থনের জন্য আপনাদের (বাংলাদেশিদের) অভিন…

নেহা বোরাপ্রেসিডেন্ট, অল ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন

প্রিয় চাঁদাবাজ ভাইয়েরা, আমাদের জানটার নিরাপত্তা দেন। আমরা আপনাদের নিয়মিত ভিক্ষা দেব, তবুও বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নষ্ট করবেন না। বাংলাদেশের প্রতিটি মো…

হাসনাত আবদুল্লাহসংসদ সদস্য, কুমিল্লা-৪

মিরপুরের টিকাকেন্দ্র-হাসপাতালের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্নির্মাণ এবং ইসিবি চত্বরের স্টুডিও হামলার ক্ষতিপূরণ সরকারকে দিতে হবে। মূল হোতাসহ জড়িত সবাইকে দ্রুত আইন…

আসিফ মাহমুদমুখপাত্র, এনসিপি

নাজিম উদ্দীনের সম্পদ মনে করে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভেঙেছে। এটা অনাকাঙিক্ষত।

রাশেদ খানপ্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী

গা'জা যু'দ্ধে হাজার হাজার শিশুসহ ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় মানবিক সহায়তা ছিল অত্যন্ত সীমিত। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে…

খলিলুর রহমানসভাপতি, সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘ

আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশ থেকে বাদ দিতে হলে সংস্কার দরকার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহ'ত্যার বিচার-এই তিনটা দাবি মানলেই কক'টেল আর ফুটবে না ঢাকা শহরে।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীমুখ্য সমন্বয়ক, এনসিপি
সব কথা

সংবাদ সংক্ষেপ

০১/০৩

নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানির অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত দাবি

দেশের নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে উদ্বেগ জানিয়েছে ন্যাশনাল স্পোর্টস অ্যালায়েন্স (এনএসএ)। দ্রুত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ৬৭ জন সাবেক ও বর্তমান নারী ক্রিকেটারের সাক্ষাৎকারে এসব অভিযোগ উঠে আসে।

এক নজরে পুরো খবর
০২/০৩

আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি ২ লাখ ২৪ হাজার ছাড়াল

দুই দিনের ব্যবধানে আবারও স্বর্ণের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরিতে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা বেড়ে নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা। পাকা স্বর্ণের দাম বাড়ায় এই সমন্বয়; বুধবার দুপুর থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।

এক নজরে পুরো খবর
০৩/০৩

মিরপুরে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ মোতায়েন

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর মিরপুরে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএমপি। মিরপুর ও পল্লবীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বাড়তি নজরদারি চলছে।

এক নজরে পুরো খবর
সব সংক্ষেপ
শনিবার৭
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
  • ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

নামাজের সময়সূচি

ঢাকা ও আশপাশ
পরবর্তী নামাজ—
  • ফজর৪:৫০ ভোর
  • সূর্যোদয়৬:০৮ সকাল
  • যোহর১১:৪৪ সকাল
  • আসর৩:৪১ বিকাল
  • মাগরিব৫:১৮ বিকাল
  • এশা৬:৩৫ সন্ধ্যা

সাহরির শেষ ৪:৪৭ ভোরইফতার ৫:১৮ বিকাল

বাংলা ভিউজ

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬


নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ১৮০ দিনের সময়সীমা ‘নির্দেশনামূলক’: হাইকোর্ট

প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে সেই কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক। ফলে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে আইনগত বাধা তৈরি হবে না।

‘মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এই সিদ্ধান্ত দেন হাইকোর্ট। ইডেন কলেজের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের এবং বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৩ সালের ৭ জুন এই রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত সময়ে কোনো মামলার বিচার শেষ করতে ব্যর্থ হলেও এ কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার বিধান নেই। ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার যে সময়সীমা আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বাধ্যতামূলক নয়; বরং নির্দেশনামূলক।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে বিচারিক কার্যক্রম বাতিল বা স্থগিত হয়ে যাবে—এমন কোনো আইনগত পরিণতির কথা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা হয়নি। তাই শুধু নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে কোনো মামলার বিচার বন্ধ হয়ে যাবে না।

প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, কলেজে যাওয়া-আসার সূত্রে আসামি মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলের সঙ্গে ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ২০ বছর বয়সী এক ছাত্রীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০০৭ সালের ৮ জুলাই পাভেলের সঙ্গে একটি বাসায় যাওয়ার পর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। পরবর্তীতে পাভেল ওই শিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণ করলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয়—এমন অভিযোগও মামলায় করা হয়।

ঘটনার পর ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগীর মা। তদন্ত শেষে পুলিশ মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার ১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই ট্রাইব্যুনাল পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

এরপর ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্টে রিট করেন পাভেল। তার দাবি ছিল, মামলাটির নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে গ্রহণ করা হলেও আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ধারায় মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

পাভেলের আবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই মামলাটির নথি ট্রাইব্যুনালে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারির ৩৪ নম্বর আদেশ থেকেও দেখা যায়, ওই সময় মামলাটি এখনো বিচারাধীন ছিল। তার দাবি ছিল, এতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩১ক ধারার বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে।

এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে ৩১ক ধারার বিধান অনুযায়ী বিচার শেষ না হওয়ার কারণ উল্লেখ করে ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল, পাবলিক প্রসিকিউটর এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি বলেও রিটে দাবি করেন পাভেল।

তার যুক্তি ছিল, আইনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হওয়ায় বিচারিক কার্যক্রম আর চলতে পারে না। এ কারণে তিনি বিচার স্থগিতের আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম প্রথমে তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং পরবর্তীতে সেই স্থগিতাদেশ বিভিন্ন সময়ে বাড়ানো হয়।

পরে মামলার উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে হাইকোর্ট রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন।

রায়ে আদালত আরও বলেন, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকার যে দাবি করা হয়েছে, তার সঙ্গে রিটকারীর উপস্থাপিত তথ্য পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রিটকারী পাভেল ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের পরবর্তী কয়েকটি আদেশ গোপন করেছেন। আদালত এটিকে রিটকারীর অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ বলে মনে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

হাইকোর্ট বলেন, মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার পক্ষে যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে, তা রিটকারীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নয়। কারণ এ ক্ষেত্রে রিটকারীর পক্ষে কোনো আইনগত অধিকার সৃষ্টি হয়নি।

সার্বিক তথ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট রুলে কোনো সারবত্তা খুঁজে পাননি। ফলে রুলটি খারিজ করে আদালত আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিলের নির্দেশ দেন।

এই রায়ের ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কোনো মামলায় ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলেও শুধু সেই কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ, স্থগিত বা বাতিল হবে না—এ বিষয়টি স্পষ্ট হলো।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ