ঢাকা    বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ ১০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ১৮০ দিনের সময়সীমা ‘নির্দেশনামূলক’: হাইকোর্ট

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে সেই কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক। ফলে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে আইনগত বাধা তৈরি হবে না।‘মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এই সিদ্ধান্ত দেন হাইকোর্ট। ইডেন কলেজের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের এবং বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৩ সালের ৭ জুন এই রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।রায়ে আদালত বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত সময়ে কোনো মামলার বিচার শেষ করতে ব্যর্থ হলেও এ কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার বিধান নেই। ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার যে সময়সীমা আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বাধ্যতামূলক নয়; বরং নির্দেশনামূলক।আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে বিচারিক কার্যক্রম বাতিল বা স্থগিত হয়ে যাবে—এমন কোনো আইনগত পরিণতির কথা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা হয়নি। তাই শুধু নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে কোনো মামলার বিচার বন্ধ হয়ে যাবে না।প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, কলেজে যাওয়া-আসার সূত্রে আসামি মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলের সঙ্গে ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ২০ বছর বয়সী এক ছাত্রীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০০৭ সালের ৮ জুলাই পাভেলের সঙ্গে একটি বাসায় যাওয়ার পর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। পরবর্তীতে পাভেল ওই শিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণ করলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয়—এমন অভিযোগও মামলায় করা হয়।ঘটনার পর ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগীর মা। তদন্ত শেষে পুলিশ মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার ১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই ট্রাইব্যুনাল পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।এরপর ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্টে রিট করেন পাভেল। তার দাবি ছিল, মামলাটির নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে গ্রহণ করা হলেও আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ধারায় মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।পাভেলের আবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই মামলাটির নথি ট্রাইব্যুনালে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারির ৩৪ নম্বর আদেশ থেকেও দেখা যায়, ওই সময় মামলাটি এখনো বিচারাধীন ছিল। তার দাবি ছিল, এতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩১ক ধারার বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে।এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে ৩১ক ধারার বিধান অনুযায়ী বিচার শেষ না হওয়ার কারণ উল্লেখ করে ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল, পাবলিক প্রসিকিউটর এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি বলেও রিটে দাবি করেন পাভেল।তার যুক্তি ছিল, আইনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হওয়ায় বিচারিক কার্যক্রম আর চলতে পারে না। এ কারণে তিনি বিচার স্থগিতের আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম প্রথমে তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং পরবর্তীতে সেই স্থগিতাদেশ বিভিন্ন সময়ে বাড়ানো হয়।পরে মামলার উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে হাইকোর্ট রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন।রায়ে আদালত আরও বলেন, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকার যে দাবি করা হয়েছে, তার সঙ্গে রিটকারীর উপস্থাপিত তথ্য পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রিটকারী পাভেল ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের পরবর্তী কয়েকটি আদেশ গোপন করেছেন। আদালত এটিকে রিটকারীর অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ বলে মনে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।হাইকোর্ট বলেন, মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার পক্ষে যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে, তা রিটকারীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নয়। কারণ এ ক্ষেত্রে রিটকারীর পক্ষে কোনো আইনগত অধিকার সৃষ্টি হয়নি।সার্বিক তথ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট রুলে কোনো সারবত্তা খুঁজে পাননি। ফলে রুলটি খারিজ করে আদালত আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিলের নির্দেশ দেন।এই রায়ের ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কোনো মামলায় ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলেও শুধু সেই কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ, স্থগিত বা বাতিল হবে না—এ বিষয়টি স্পষ্ট হলো।

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ১৮০ দিনের সময়সীমা ‘নির্দেশনামূলক’: হাইকোর্ট