নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় যুক্ত করা না গেলে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী-২ ও সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম। নারী উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ৮১টি মিশনকে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম) প্রাঙ্গণে জাতীয় এসএমই নারী উদ্যোক্তা সামিট ও পণ্য মেলা-২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
‘নারী উদ্যোক্তার অগ্রযাত্রায় সমৃদ্ধ হবে আগামীর বাংলাদেশ’ স্লোগানে ৫ নভেম্বর শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনে ছিল ৬০টি স্টল।
শামা ওবায়েদ বলেন, দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী নারী। তাঁদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাইরে রেখে সামগ্রিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। উন্নয়নের সুফল চট্টগ্রাম থেকে রংপুর কিংবা যশোর থেকে ফরিদপুর—সব এলাকার নারীর কাছে সমানভাবে পৌঁছানো প্রয়োজন।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধার পরিবর্তে অন্য উদ্যোক্তাদের মতো সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে কাউকে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আগে ‘নারী’ শব্দটি ব্যবহার করার প্রয়োজন থাকবে না। নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেই প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব।
নারী উদ্যোক্তাদের নানা প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যশোরের কোনো নারী নকশিকাঁথা তৈরি করছেন, রংপুরের কেউ শতরঞ্জি বানাচ্ছেন, আবার চট্টগ্রামের কোনো তরুণী অনলাইনে খাবারের ব্যবসা করছেন। কিন্তু পণ্য বাজারজাত করা, নতুন ক্রেতা ও বাজার খুঁজে পাওয়া, অর্থায়ন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে অনেকেই ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। এসব সমস্যা সমাধানে তাঁদের জন্য সমন্বিত সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা দরকার।
আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর বিষয়ে শামা ওবায়েদ জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ৮১টি মিশনকে স্থানীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা ও সম্ভাবনা অনুসন্ধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোন দেশে কী ধরনের পণ্যের চাহিদা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট বাজারের সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ স্থাপনে মিশনগুলো কাজ করবে।
এ ছাড়া বিদেশি কূটনীতিক, মন্ত্রী ও প্রতিনিধিদের সামনে নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য তুলে ধরার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এ উদ্দেশ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি স্থানে তাঁদের পণ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে চান প্রতিমন্ত্রী। এসএমই ফাউন্ডেশন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা যোগাযোগ করলে উদ্যোগটি বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া সম্ভব বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনা তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, বর্তমান বাজেটে এ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, শিল্পকলা, ফটোগ্রাফি, চলচ্চিত্র, নাটক, নাচ, পাটজাত পণ্য, প্রসাধনী ও গহনাসহ বিভিন্ন বিষয় সৃজনশীল অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত। এ খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ও অবদান উল্লেখযোগ্য। তাই দেশীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত করতে এ সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন।
নারী শিক্ষার প্রসারে সরকারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের মেয়েদের প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধেও কাজ চলছে। তাঁর মতে, শিক্ষার সুযোগ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে নারীরা আরও বেশি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে পারবেন।
নিজেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, প্রত্যেক নারী উদ্যোক্তার পেছনেই সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা দেশের ১৭ কোটি মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে নতুন প্রজন্মের মেয়েরা অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন।
আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলোতে নারী ক্ষমতায়ন এবং নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরার কথাও জানান তিনি। নতুন বাজার অনুসন্ধান, অর্থায়ন, ব্যাংকঋণ সহজ করা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করবে বলে আশ্বাস দেন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশসহ যেকোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে উদ্যোক্তাদের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিভাগ থেকে উদ্যোক্তা হিসেবে সম্মাননা পাওয়া সাগুফতা সুলতানা বলেন, নারীরা নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চেষ্টা করছেন। এ ধরনের স্বীকৃতি তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়।
নিজের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, চাকরিপ্রার্থী না হয়ে চাকরিদাতা হওয়ার লক্ষ্য থেকে নতুন প্রজন্ম উদ্যোক্তা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ও স্বদেশি উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলায় উদ্যোক্তা উন্নয়নে কাজ করছেন তিনি।
সাগুফতা সুলতানার মতে, দেশে উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের দক্ষতা ও কাজের মান উন্নয়নে আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। অনেক নারী মাত্র তিন থেকে সাত দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করেন। অথচ পণ্যের সঠিক মাপ নেওয়াসহ ব্যবসা পরিচালনার মৌলিক ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এ কারণে প্রশিক্ষণের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের সামিট আয়োজনের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরিরও অনুরোধ করেন।
সম্মেলনের অংশ হিসেবে এর আগে আটজন নারী উদ্যোক্তাকে সম্মাননা দেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। সম্মাননাপ্রাপ্তরা হলেন—ঢাকা বিভাগের সাগুফতা সুলতানা, চট্টগ্রাম বিভাগের মঞ্জুলিকা চাকমা, সিলেট বিভাগের শান্তনা, ময়মনসিংহ বিভাগের হেনা খাতুন, রাজশাহী বিভাগের আফরোজা আজিজ মুন্নি, রংপুর বিভাগের উম্মে কুলসুম পপি, বরিশাল বিভাগের বিলকিস আহমেদ লিলি এবং খুলনা বিভাগের মরিয়ম নার্গিস।
পরে প্রতিমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। এ সময় শিল্প মন্ত্রণালয় ও এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।














মন্তব্যসমূহ