দেশে চলমান হাম প্রাদুর্ভাবে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৫৭ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ছোট শিশুদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০১ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৫৬ জনের। এ সময় সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮১৪ জনে। পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হয়েছে ২০ হাজার ৫৬২ জনের।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৪৮ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং পরীক্ষায় ৮৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের সঙ্গে এসব পরিসংখ্যান সামঞ্জস্যপূর্ণ।
১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫৮৯ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ১ লাখ ৫২ হাজার ২২৫ জন হাসপাতাল ছেড়েছে।
রাজধানীর হাসপাতালগুলোতেও হাম আক্রান্ত শিশুদের চাপ রয়েছে। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের অক্সিজেন, স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর সংখ্যা বেশি থাকায় কোনো কোনো পরিবারকে শয্যার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকাদানের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা স্বজনদের কয়েকজন রোগীর চাপের কারণে ভোগান্তির কথাও জানিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় আসা আয়েশা আক্তার জানান, অন্য একটি হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ায় তাদের মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। শুরুতে সেখানেও শয্যা পাওয়া যায়নি, পরে একটি শয্যার ব্যবস্থা হয়।
আরেক অভিভাবক আবদুর রহিম জানান, প্রথমে বাড়িতেই তার ছেলের চিকিৎসা চলছিল। পরে একটি বেসরকারি ক্লিনিকের চিকিৎসক শিশুটির মধ্যে হামের উপসর্গ দেখতে পেয়ে সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
চলতি বছরের শুরু থেকেই বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত এপ্রিলে জানায়, তখন দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময় শনাক্ত রোগীদের বড় অংশ ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার দেশব্যাপী মজুত সংকট, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম না থাকায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে টিকা না পাওয়া বা প্রয়োজনীয় ডোজ সম্পন্ন না করা অনেক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে।
প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য অংশীদারের সহযোগিতায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রথমে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যক্রম শুরু হলেও পরে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ের জরুরি টিকাদান কার্যক্রম ২০ এপ্রিল শুরু হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, টিকা না পাওয়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে সুরক্ষার আওতায় আনা এবং রোগ নজরদারি জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটি হাম নিয়ন্ত্রণে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের টিকায় অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে।