দেশে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশে উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে—এমন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ের নিজ কার্যালয় থেকে হেঁটে কৃষি মন্ত্রণালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। পরে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে কৃষি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, চলমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও লাভজনক করতে হবে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দিকেও নজর দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশে সরিষার উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সরিষার উৎপাদন ৮ দশমিক ২৪ লাখ মেট্রিক টন থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১৫ দশমিক ৩৪ লাখ টনে পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন আরও বেড়ে ১৫ দশমিক ৪১ লাখ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।
পেঁয়াজের উৎপাদন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণে এয়ার-ফ্লো প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের জাত সম্প্রসারণের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতা সহনশীল বিভিন্ন নতুন জাতের ফসল মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের কাজ চলছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
কৃষি গবেষণার অগ্রগতি তুলে ধরে কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন ফসলের ১ হাজার ৯০টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে ধানের জাত রয়েছে ১৫৫টি। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এক হাজারের বেশি কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের তথ্যও বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।
কৃষিতে শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যান্ত্রিকীকরণের ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। দেশীয় কৃষিযন্ত্রের উদ্ভাবন ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মতো যন্ত্র কৃষকদের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।
কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। বর্তমানে দেশে ২ হাজার ৬১৭টি সৌর সেচব্যবস্থা রয়েছে বলে জানানো হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর সেচের পরিধি বাড়ানো গেলে কৃষকের সেচ ব্যয় এবং প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে বৈঠকে মত দেওয়া হয়।
সরকারি সহায়তা সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে কৃষক কার্ড কর্মসূচিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। প্রথম ধাপে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কৃষককে কার্ড দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণনসহ কৃষি খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে উৎপাদন করা সম্ভব এমন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমাতে হবে। এ জন্য কৃষি গবেষণা, উন্নত জাত, আধুনিক প্রযুক্তি, সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের সুবিধা দ্রুত কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে দেশীয় উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে।