ভারত ও চীনের মধ্যকার বিতর্কিত অরুণাচল প্রদেশ সীমান্তে চীনের অবকাঠামো নির্মাণ ও সামরিক তৎপরতা দ্রুত বাড়ছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট। এমন এক সময়ে এ তথ্য সামনে এসেছে, যখন ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অরুণাচলের আপার সুবনসিরি উপত্যকার কাছাকাছি বেশ কয়েকটি এলাকায় নতুন ভবন, পাকা সড়ক ও হেলিপ্যাড তৈরি হয়েছে। তিব্বতের লুনজে কাউন্টির উত্তরে ঝারি শহরের আশপাশে দুটি স্থানে তুলনামূলকভাবে বেশি নির্মাণকাজ দেখা গেছে।
ওপেন সোর্স গোয়েন্দা সংস্থা জেনসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারত ও চীনের দাবি করা সীমান্তরেখা বিবেচনায় এসব স্থাপনার কিছু অংশ বিতর্কিত এলাকার মধ্যে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঝারি শহরের দক্ষিণে ২০১৯ সাল থেকে একটি বড় নির্মাণকাজ চলছে। সেখানে জমি সমতলীকরণ, ভারী প্রকৌশল যন্ত্রপাতি এবং কংক্রিট মিশ্রণ প্ল্যান্ট দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, স্থাপনাটি ভবিষ্যতে সামরিক কাজেও ব্যবহার করা হতে পারে।
লুনজের দক্ষিণে আগে থাকা দুটি ছোট হেলিপ্যাডের জায়গায় একটি বড় হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। আরও দক্ষিণে নতুন আরেকটি হেলিপ্যাডও তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ধারণ করা সর্বশেষ স্যাটেলাইট ছবিতে অন্তত একটি ভবনের ছাদ নির্মাণ শেষ হতে দেখা গেছে।
সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের গেলেমো গ্রামের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, চীনা বাহিনী স্থানীয়দের পূর্বপুরুষের জমির দিকে ক্রমাগত এগিয়ে আসছে। তার দাবি, ঠিক কতটা এলাকা চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে তা বলা কঠিন হলেও পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়ছে।
অল তাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি তাদক পাকবার নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি দল গত ১১ থেকে ১৩ আগস্ট গেলেমো ও তাকসিং এলাকায় সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে। তাদের দাবি, জুন থেকে সীমান্ত পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে।
পাকবার অভিযোগ, স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের শিকার ও পশুচারণের কিছু এলাকায় এখন আর যেতে দেওয়া হচ্ছে না। তার ভাষ্য, চীনা বাহিনী ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসছে, অন্যদিকে ভারতীয় বাহিনীর চলাচল সীমিত হচ্ছে।
স্থানীয় আদিবাসী সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও অভিযোগ করেছে, সীমান্তঘেঁষা চারণভূমি ও বনাঞ্চলে চীনা বাহিনী সড়ক, সেতু এবং সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করেছে।
ক্ষমতাসীন বিজেপির জোটসঙ্গী পিপলস পার্টি অব অরুণাচলের একটি প্রতিনিধিদলও তাকসিং, গেলেমো ও মাজা এলাকা পরিদর্শন করেছে। দলের সদস্য ও সাবেক রাজ্য মন্ত্রী কাপা বেংগিয়া দাবি করেন, চীনা সেনারা কিছু এলাকায় সামনে এগিয়ে এসেছে এবং ভারতীয় টহল দল নিজেদের দাবি করা এলাকাতেও প্রবেশে বাধার মুখে পড়ছে।
তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোকে ভুল ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, সীমান্তের পরিস্থিতি ভারত ও চীনের সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও চিয়াকুন দাবি করেছেন, দুই দেশের সীমান্ত পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর জানিয়েছেন, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা দেওয়া হবে।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লির মতে, চীনের এই অগ্রযাত্রাকে তথাকথিত ‘সালামি স্লাইসিং’ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই কৌশলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান না চালিয়ে ধীরে ধীরে ছোট ছোট এলাকায় উপস্থিতি বাড়ানো হয়।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শুরুতে সীমান্ত এলাকায় পশু ছেড়ে প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে। এরপর বাধা না এলে অস্থায়ী স্থাপনা, পরে স্থায়ী ভবন এবং একপর্যায়ে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা হতে পারে।
২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষের পর এটিই শি জিনপিংয়ের প্রথম দিল্লি সফর। ওই সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ সদস্যের বড় একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে শি জিনপিং নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি চীনের অন্যতম বড় সরকারি প্রতিনিধিদল।
সীমান্তে নতুন নির্মাণ ও স্থানীয়দের অভিযোগ সামনে এলেও ভারত ও চীন উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার মতো উত্তেজনাপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করছে না। তবে সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণ দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।