শুধু ঋণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উপজেলা পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন কর্মসূচি নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ’ নামের এই কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যবসার ধারণা থাকলেও অর্থের অভাবে উদ্যোগ শুরু করতে না পারা তরুণদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কর্মসূচির আওতায় ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত তরুণরা নতুন ব্যবসা শুরু অথবা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। ব্যবসার প্রয়োজন ও ব্যয় পরিকল্পনা যাচাই করে একজন উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন দেওয়া হতে পারে।
এই অর্থায়নের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে প্রত্যেক আবেদনকারীকে নির্ধারিত সর্বোচ্চ অর্থ দেওয়া হবে না; ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, অনেক তরুণের ব্যবসার আগ্রহ ও সম্ভাবনাময় ধারণা থাকলেও জামানত, অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে তারা ব্যাংকঋণ থেকে বঞ্চিত হন। আবার উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় অনেক ব্যবসা থাকলেও সেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের আওতায় আসে না। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়েই এসব উদ্যোক্তাকে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উপজেলায় বাড়বে ব্যাংকের ভূমিকা
‘উদ্যোগ’ কর্মসূচিতে ব্যাংকের দায়িত্ব শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সংশ্লিষ্ট উপজেলার তফসিলি ব্যাংকের শাখাগুলো স্থানীয়ভাবে প্রচার চালিয়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা খুঁজে বের করবে। আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা বাছাইয়ের বিভিন্ন ধাপেও ব্যাংকগুলো যুক্ত থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি উপজেলায় একটি তফসিলি ব্যাংককে লিড ব্যাংক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। জেলা পর্যায়ের আবেদন ও কর্মসূচির বিভিন্ন কার্যক্রমও এই ব্যাংকের মাধ্যমে সমন্বয় করা হবে।
আগ্রহী তরুণরা সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় আবেদন করতে পারবেন। যে ব্যাংকে আবেদন করা হবে, সেখানে আগে থেকেই হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। আবেদনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, ছবি, নির্ধারিত ফরম এবং স্থায়ী বাসিন্দার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হবে।
জামানত ছাড়াই ঋণের সুযোগ
তরুণদের ব্যবসায়িক অর্থায়নের ক্ষেত্রে জামানতের বাধা কমাতে নতুন কর্মসূচিতে সহায়ক জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে জমি, বাড়ি বা অন্য সম্পদ বন্ধক রাখার সক্ষমতা না থাকলেও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকলে অর্থায়নের সুযোগ মিলতে পারে।
তবে জামানত না থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ পাওয়া যাবে না। উদ্যোক্তা নির্বাচিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব ঋণনীতি ও প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে ঋণ অনুমোদন করবে। নির্বাচিত উদ্যোক্তার ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।
কোনো আবেদন বাতিল হলে তার কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে তা জানাতে হবে। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তা নির্বাচন ও ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ
নতুন কর্মসূচিতে শুধু অর্থায়ন নয়, উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ জন্য আর্থিক সাক্ষরতা, প্রশিক্ষণ, মেন্টরের পরামর্শ এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজারের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ তৈরির উদ্যোগও থাকবে।
কৃষি থেকে প্রযুক্তি—বিস্তৃত খাত
‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি কোনো নির্দিষ্ট খাতের ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য, পশুপালন, হস্তশিল্প, পর্যটন, সেবা, হালকা প্রকৌশল, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাত এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্স, ফিনটেক, এডটেক, এগ্রিটেক ও হেলথটেকের মতো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগও বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে স্থানীয় চাহিদা ও সম্পদের ভিত্তিতে ব্যবসা তৈরির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ পাবেন তরুণরা।
ব্যবসার সম্ভাবনার ভিত্তিতে হবে বাছাই
উদ্যোক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু বয়স বা আবেদন করাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে না। ব্যবসার ধারণার বাস্তবতা, পণ্য বা সেবার বাজার সম্ভাবনা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা, আর্থিক পরিকল্পনা এবং কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করা হবে।
বাছাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক, সফল উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, শিল্প বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ব্যবসার সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তার সক্ষমতার ভিত্তিতে উপযুক্ত আবেদনকারী বাছাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থ ব্যবহারে থাকবে নজরদারি
অর্থ দেওয়ার পরও উদ্যোক্তার ব্যবসার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। ব্যবসার বিক্রি, নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে।
বিশেষ করে অনুদানের অর্থ অনুমোদিত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা হবে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা বা অনুদানের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার না করার ক্ষেত্রে অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ ঋণে রূপান্তরিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মসূচির মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং, ব্যবসায়িক নিবন্ধন ও বাজারসংযোগের সুযোগ থাকায় কর্মসূচিটি স্থানীয় পর্যায়ে নতুন ব্যবসা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রকৃত উদ্যোক্তা নির্বাচন, দ্রুত অর্থ ছাড় এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই কর্মসূচিটির সফলতার মূল চ্যালেঞ্জ হবে।