ঢাকা    বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ ১০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

নতুন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে মিশ্র চিত্র

নতুন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে মিশ্র চিত্র
সংগৃহীত
ফলো করুন

প্রচলিত পশ্চিমা বাজারের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা মিশ্র ফল দিচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও ভারত, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ও রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত গন্তব্যে রপ্তানি কমেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ের দেশভিত্তিক রপ্তানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার বাইরে রপ্তানি সম্প্রসারণের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত অপ্রচলিত বাজারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায়নি।

এমন এক সময়ে এই মিশ্র চিত্র সামনে এলো, যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন করে গুরুত্ব আরোপ করেছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিল্পখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে বিশেষ অর্থায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে চীন। ওভেন পোশাক, নিটওয়্যার, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য এবং জুতার রপ্তানির ওপর ভর করে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ৭৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিলেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের বাড়তে থাকা চাহিদার ইঙ্গিত দেয়।

তবে সামগ্রিক চিত্রটি সমান নয়। জুলাই-মে সময়ে ১৬১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অপ্রচলিত রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রাখলেও দেশটিতে রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে। অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি ৮ দশমিক ৬২ শতাংশ কমে ৭৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে তুরস্কে রপ্তানি ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩ কোটি ৪৫ লাখ ৭০ হাজার ডলারে। চলমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে রাশিয়ার বাজারেও রপ্তানি সংকুচিত হয়েছে।

এই প্রবণতার প্রভাব পড়েছে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সংকলিত ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-মে সময়ে অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানি ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। দেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি সামান্য ০ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কানাডায় রপ্তানি ২ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও যুক্তরাজ্যে তা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। সব মিলিয়ে এই সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

ইপিবির তথ্য আরও বলছে, অনেক অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির ঝুড়ি এখনও ঐতিহ্যবাহী শ্রমনির্ভর পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। ভারতে প্রধানত পোশাক, পাটপণ্য, চামড়াজাত পণ্য, তুলাজাত পণ্য ও প্লাস্টিক রপ্তানি হয়। অস্ট্রেলিয়ায় পোশাক ও হোম টেক্সটাইল এবং তুরস্কে নিটওয়্যার, ওভেন পোশাক ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির বড় অংশ দখল করে আছে।

তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছে চীন। পোশাকের পাশাপাশি দেশটিতে চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজারটিতে বাংলাদেশের পণ্য বহুমুখীকরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রাক্কালে অপ্রচলিত বাজারগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তবে এসব বাজারের অনেক ক্রেতা রপ্তানি ঋণসুবিধা না দেওয়ায় রপ্তানিকারকেরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।

তিনি বলেন, “জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে। তবে বাজার বহুমুখীকরণের গতি এখন আরও বাড়াতে হবে। এলডিসি উত্তরণের আগে যদি আমরা পর্যাপ্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে এবং অপ্রচলিত বাজার থেকে রপ্তানি আয় বাড়াতে ব্যর্থ হই, তাহলে দেশের রপ্তানি খাত মারাত্মক চাপের মুখে পড়তে পারে।”

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। জাপানে উল্লেখযোগ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জনের আগে রপ্তানিকারক, শিল্প সংগঠন ও সরকারি সংস্থাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও রাশিয়ার মতো বাজারেও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, তুরস্কে উচ্চ আমদানি শুল্ক এবং ভারতে দীর্ঘদিনের বাজারপ্রবেশ বাধা দূর করতে সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে আরও কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা জরুরি। রপ্তানি প্রণোদনার পাশাপাশি শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

তার ভাষায়, “বাংলাদেশ আর শুধু প্রচলিত পোশাক রপ্তানি বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত বাজারের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারবে না। এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে পণ্যের বহুমুখীকরণ, শক্তিশালী বাণিজ্য চুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার নিশ্চিত করতে হবে।”

ইপিবির সর্বশেষ তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ কৌশল নির্বাচিত কিছু বাজারে ইতোমধ্যে সুফল দিতে শুরু করেছে, বিশেষ করে চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে। তবে অধিকাংশ অপ্রচলিত বাজারে ফলাফল এখনও অসম। ফলে এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় টেকসই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে নতুন বাজারের পাশাপাশি নতুন পণ্যের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতি ও বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ সম্প্রসারণই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী রপ্তানি কৌশলের মূল ভিত্তি।

ট্যাগ : রপ্তানি অপ্রচলিত বাজার ইপিবি এলডিসি উত্তরণ

বাংলা ভিউজ

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নতুন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে মিশ্র চিত্র

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬

featured Image

প্রচলিত পশ্চিমা বাজারের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা মিশ্র ফল দিচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও ভারত, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ও রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত গন্তব্যে রপ্তানি কমেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ের দেশভিত্তিক রপ্তানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার বাইরে রপ্তানি সম্প্রসারণের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত অপ্রচলিত বাজারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায়নি।

এমন এক সময়ে এই মিশ্র চিত্র সামনে এলো, যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন করে গুরুত্ব আরোপ করেছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিল্পখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে বিশেষ অর্থায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে চীন। ওভেন পোশাক, নিটওয়্যার, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য এবং জুতার রপ্তানির ওপর ভর করে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ৭৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিলেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের বাড়তে থাকা চাহিদার ইঙ্গিত দেয়।

তবে সামগ্রিক চিত্রটি সমান নয়। জুলাই-মে সময়ে ১৬১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অপ্রচলিত রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রাখলেও দেশটিতে রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে। অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি ৮ দশমিক ৬২ শতাংশ কমে ৭৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে তুরস্কে রপ্তানি ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩ কোটি ৪৫ লাখ ৭০ হাজার ডলারে। চলমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে রাশিয়ার বাজারেও রপ্তানি সংকুচিত হয়েছে।

এই প্রবণতার প্রভাব পড়েছে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সংকলিত ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-মে সময়ে অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানি ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। দেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি সামান্য ০ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কানাডায় রপ্তানি ২ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও যুক্তরাজ্যে তা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। সব মিলিয়ে এই সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

ইপিবির তথ্য আরও বলছে, অনেক অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির ঝুড়ি এখনও ঐতিহ্যবাহী শ্রমনির্ভর পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। ভারতে প্রধানত পোশাক, পাটপণ্য, চামড়াজাত পণ্য, তুলাজাত পণ্য ও প্লাস্টিক রপ্তানি হয়। অস্ট্রেলিয়ায় পোশাক ও হোম টেক্সটাইল এবং তুরস্কে নিটওয়্যার, ওভেন পোশাক ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির বড় অংশ দখল করে আছে।

তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছে চীন। পোশাকের পাশাপাশি দেশটিতে চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজারটিতে বাংলাদেশের পণ্য বহুমুখীকরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রাক্কালে অপ্রচলিত বাজারগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তবে এসব বাজারের অনেক ক্রেতা রপ্তানি ঋণসুবিধা না দেওয়ায় রপ্তানিকারকেরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।

তিনি বলেন, “জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে। তবে বাজার বহুমুখীকরণের গতি এখন আরও বাড়াতে হবে। এলডিসি উত্তরণের আগে যদি আমরা পর্যাপ্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে এবং অপ্রচলিত বাজার থেকে রপ্তানি আয় বাড়াতে ব্যর্থ হই, তাহলে দেশের রপ্তানি খাত মারাত্মক চাপের মুখে পড়তে পারে।”

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। জাপানে উল্লেখযোগ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জনের আগে রপ্তানিকারক, শিল্প সংগঠন ও সরকারি সংস্থাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও রাশিয়ার মতো বাজারেও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, তুরস্কে উচ্চ আমদানি শুল্ক এবং ভারতে দীর্ঘদিনের বাজারপ্রবেশ বাধা দূর করতে সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে আরও কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা জরুরি। রপ্তানি প্রণোদনার পাশাপাশি শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

তার ভাষায়, “বাংলাদেশ আর শুধু প্রচলিত পোশাক রপ্তানি বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত বাজারের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারবে না। এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে পণ্যের বহুমুখীকরণ, শক্তিশালী বাণিজ্য চুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার নিশ্চিত করতে হবে।”

ইপিবির সর্বশেষ তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ কৌশল নির্বাচিত কিছু বাজারে ইতোমধ্যে সুফল দিতে শুরু করেছে, বিশেষ করে চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে। তবে অধিকাংশ অপ্রচলিত বাজারে ফলাফল এখনও অসম। ফলে এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় টেকসই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে নতুন বাজারের পাশাপাশি নতুন পণ্যের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতি ও বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ সম্প্রসারণই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী রপ্তানি কৌশলের মূল ভিত্তি।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ