সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কর কেটে নেওয়ার প্রচলিত নিয়মে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে কর বিভাগ। এর ফলে সীমিত আয়ের মানুষ, প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য আর্থিক স্বস্তির নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসার চালান এবং যাঁদের অন্য কোনো উল্লেখযোগ্য আয় নেই, তাঁরা উৎসে কেটে নেওয়া করের পুরো টাকাই ফেরত পেতে পারেন। তবে এই সুবিধা পাওয়ার জন্য করদাতাদের অবশ্যই আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।
অন্যদিকে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার পাশাপাশি যাঁদের বেতন, বাড়িভাড়া কিংবা ব্যবসা থেকে নিয়মিত আয় রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সামগ্রিক বার্ষিক আয়ের ওপর ভিত্তি করে করের মোট দায় আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
পূর্বে টিআইএনধারী বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বিতরণের সময় ১০ শতাংশ এবং টিআইএন না থাকলে ১৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখা হতো। এই কর্তিত অর্থকে ‘চূড়ান্ত কর’ হিসেবে গণ্য করা হতো, যার ফলে প্রকৃত করযোগ্য আয় না থাকা সত্ত্বেও কেটে নেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার কোনো আইনি সুযোগ ছিল না। কিন্তু নতুন বিধিমোতাবেক, উৎসে কেটে রাখা এই কর আর চূড়ান্ত কর নয়; বরং তা বিনিয়োগকারীর ‘অগ্রিম কর’ হিসেবে বিবেচিত হবে। বছর শেষে বিনিয়োগকারীর সব ধরনের আয় একত্র করে মোট আয়ের ওপর প্রযোজ্য করহার (১০, ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ শতাংশ) অনুযায়ী চূড়ান্ত কর নিরূপণ করা হবে। এরপর পূর্বে কেটে রাখা অগ্রিম করের সঙ্গে তা সমন্বয় করা হবে। কর্তিত অর্থের চেয়ে প্রকৃত করের দায় কম হলে অতিরিক্ত অর্থ করদাতা ফেরত পাবেন, আর করের দায় বেশি হলে অবশিষ্ট অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হবে।
নতুন নিয়মে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন তাঁরা, যাঁদের মোট বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার নিচে। ধরা যাক, একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি সঞ্চয়পত্র থেকে বছরে ১ লাখ টাকা মুনাফা পেলেন এবং তাঁর ১০ হাজার টাকা উৎসে কর কাটা হলো। যদি তাঁর অন্য কোনো আয় না থাকে এবং বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকে, তবে তাঁর ওপর প্রকৃত করের দায় দাঁড়াবে শূন্য টাকা। ফলে কেটে নেওয়া পুরো ১০ হাজার টাকাই তিনি রিটার্নে দাবি করে ফেরত পাবেন।
তবে যাঁদের অন্যান্য উৎস থেকে উল্লেখযোগ্য আয় রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে মোট আয় বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তির সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ৫ লাখ টাকা (যেখানে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম কর কাটা হয়েছে) এবং অন্যান্য উৎস থেকে আয় ৪ লাখ টাকা হলে, মোট ৯ লাখ টাকার ওপর স্ল্যাব অনুযায়ী মোট কর দাঁড়াতে পারে ৬০ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে পূর্বে ৫০ হাজার টাকা কর্তন থাকায় বাকি ১০ হাজার টাকা তাঁকে নতুন করে পরিশোধ করতে হবে।
সঞ্চয়পত্রের কেটে রাখা কর ফেরত পেতে হলে করদাতাকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে: ১. বিনিয়োগকারীর নিজস্ব টিআইএন (TIN) থাকতে হবে।
২. নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।
৩. রিটার্নে সঞ্চয়পত্রের মুনাফাসহ সকল আয়ের বিবরণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
৪. সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা সঞ্চয় ব্যুরো থেকে মুনাফার বিপরীতে কেটে রাখা উৎসে কর কর্তনের সনদপত্র (Tax Deduction Certificate) সংযুক্ত করতে হবে।
৫. রিটার্নে করদাতার সক্রিয় ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ রিফান্ডের জন্য স্পষ্ট আবেদন জানাতে হবে।
কর বিভাগের বিধিবিধান অনুযায়ী, রিটার্ন ও দাখিলকৃত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে নির্ধারিত ১২০ দিনের মধ্যে প্রাপ্য রিফান্ডের অর্থ সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের কথা রয়েছে।














মন্তব্যসমূহ