সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রের জন্য ব্যবসায়ীদের বছরে লাখ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত অর্থ ব্যয় করতে না হলে কারখানা মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া অনায়াসেই সম্ভব হতো বলে মন্তব্য করেছেন নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ নগরীর চাঁদমারি এলাকায় চেম্বার ভবনে তৈরি পোশাক খাতে সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতা নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি মতবিনিময় সভায় তিনি এসব ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও চেম্বারের বর্তমান সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে মাসুদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের প্রধান দাবি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে—আপনারা আমাদের সত্যিকার অর্থে ওয়ান স্টপ সার্ভিস দিন। কাগজের নামে বিভিন্ন দপ্তরের টেবিল ঘোরানো বন্ধ করুন, তাহলে শ্রমিকের কত টাকা বেতন দিতে হয় তা আমরা নিজেদের তহবিল থেকেই সানন্দে দেব।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘যেখানেই কাগজ লাগে সেখানেই টাকা ঢালতে হয়। এভাবে ঘুষ ও বাড়তি অর্থ দিতে দিতে কারখানা মালিকদের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বছরে লাখ লাখ, কোটি কোটি টাকা বিভিন্ন জায়গায় দিতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত টাকা যদি প্রশাসনিক জটিলতায় না যেত, তবে তা সরাসরি আমাদের মেহনতি শ্রমিকদের বেতন-ভাতা হিসেবে দিতে পারতাম।’
নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষ, ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তোলেন এই ব্যবসায়ী নেতা। তাঁর মতে, এ ধরনের জাতীয় শিল্প সংকটের মুহূর্তে বিরোধী দলগুলোর নিষ্ক্রিয় বা সুবিধাবাদী ভূমিকা ব্যবসায়ীদের কাছে চরম প্রশ্নবিদ্ধ, রহস্যজনক ও হতাশাজনক মনে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্যি, এটা আমাদের দেশ এবং এর যেকোনো সংকটের সমাধান নিজেদেরই খুঁজে বের করতে হবে।’
সাম্প্রতিক তিন দিনের সহিংস ঘটনাপ্রবাহকে নিজের ব্যবসায়ী জীবনের এক অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করে মাসুদুজ্জামান বলেন, একটি স্থায়ী ও যৌক্তিক মজুরি বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়ার আগেই শিল্পাঞ্চলে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের পরিস্থিতি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যার কোনো বাস্তবিক প্রয়োজন ছিল না। এ ধরনের অস্থিরতার সাথে মূলধারার কোনো শিল্প মালিক বা সাধারণ শ্রমিকের যোগসাজশ ছিল না এবং কারও কার্যকর মতামতও নেওয়া হয়নি।
শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবির বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, এ ধরনের দাবি পর্যালোচনা করে বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো নির্ধারণের এখতিয়ার কেবল জাতীয় মজুরি বোর্ডের। এজন্য বোর্ডকে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই ও কাজ করার মতো ন্যূনতম সময় দেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার আগেই পরিকল্পিতভাবে প্রায় ৬৭ থেকে ৬৮টি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের তাণ্ডব চালানো হয়। এসব পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে তৃতীয় কোনো অপশক্তির গভীর ষড়যন্ত্র ও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলন বা গণতান্ত্রিক অধিকারকে দমিয়ে রাখা কখনো ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য ছিল না। তবে জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে সংকট মোকাবিলায় প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত অবস্থান ও দায়িত্বশীল সহযোগিতা অত্যন্ত আবশ্যক ছিল। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর সমঝোতা ও আলোচনার উদ্যোগ থাকলে শ্রমিক, মালিক এবং পুরো তৈরি পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব হতো।














মন্তব্যসমূহ