ঢাকা    বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ ১০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

আশুরা : ইতিহাস, ফজিলত ও শিক্ষার এক মহিমান্বিত দিন

আশুরা : ইতিহাস, ফজিলত ও শিক্ষার এক মহিমান্বিত দিন
সংগৃহীত
ফলো করুন

আশুরা ইসলামের ইতিহাসে এক মহিমান্বিত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহাররমের ১০ তারিখকে বলা হয় ‘ইয়াওমে আশুরা’। এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক নয়; বরং আল্লাহর সাহায্য, সত্যের বিজয়, জুলুমের পরাজয় এবং ঈমানদারদের জন্য শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষ।

‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘দশ’। সে কারণেই মুহাররমের দশম দিনকে আশুরা বলা হয়। অনেকের ধারণা, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার কারণেই আশুরার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, কারবালার ঘটনার বহু আগেই এই দিনটি ছিল ফজিলতপূর্ণ ও সম্মানিত। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মানুষ আশুরার রোজা রাখত এবং কাবা শরিফে এ দিন গিলাফ পরানো হতো। পরে রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা ঐচ্ছিক হয়ে যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৯২)

আশুরার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা হলো—আল্লাহ তাআলা এই দিনে হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলকে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সমুদ্রে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “অতঃপর আমি মূসা ও তাঁর সঙ্গীদের সবাইকে রক্ষা করলাম। তারপর অপর দলকে ডুবিয়ে দিলাম।” (সুরা আশ-শুআরা: ৬৫-৬৬)

ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার রোজা রাখছে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, এ দিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “মুসার সঙ্গে তোমাদের চেয়ে আমাদের সম্পর্ক বেশি।” এরপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৪৩)

আশুরার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রোজা রাখা। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের সগিরা গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) চেয়েছিলেন মুসলমানরা যেন ইহুদি-খ্রিস্টানদের অনুকরণ না করে। তাই তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে, পরবর্তী বছর বেঁচে থাকলে তিনি নবম তারিখও রোজা রাখবেন। কিন্তু সে বছরের আগেই তিনি ইন্তিকাল করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪) এ কারণে ইসলামি চিন্তাবিদরা ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখাকে উত্তম বলেছেন।

সাহাবায়ে কেরামও আশুরার রোজাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। হজরত রুবাইয়্যি‘ বিনতে মুআউয়িজ (রা.) বলেন, তারা নিজেরাও রোজা রাখতেন এবং শিশুদেরও রোজায় অভ্যস্ত করতেন। শিশুরা ক্ষুধার কারণে কাঁদলে খেলনা দিয়ে তাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে ইফতার পর্যন্ত সময় পার করাতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬০)

৬১ হিজরির ১০ মুহাররমে কারবালার প্রান্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। এটি ইসলামের ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক ঘটনা, যা মুসলিম উম্মাহ গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তবে ইসলামী সূত্র অনুযায়ী, হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত আশুরার মর্যাদা সৃষ্টি করেনি; বরং আশুরা এর আগ থেকেই ফজিলতপূর্ণ দিন হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

আশুরাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের বর্ণনা ও প্রচলিত রেওয়াজ সমাজে দেখা যায়। তবে একজন মুসলমানের উচিত কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে এ দিনের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা। আশুরা কোনো শোকের দিন নয়, আবার শুধু আনন্দের দিনও নয়; এটি ইবাদত, আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের এক বিশেষ সুযোগ।

তাই ভিত্তিহীন কাহিনি, অতিরঞ্জন ও বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস থেকে দূরে থেকে সহিহ সুন্নাহ অনুসরণ করা, ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখা এবং এ দিনের শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করাই হওয়া উচিত প্রত্যেক মুসলমানের করণীয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ট্যাগ : ইসলাম পবিত্র কোরআন আশুরা

বাংলা ভিউজ

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


আশুরা : ইতিহাস, ফজিলত ও শিক্ষার এক মহিমান্বিত দিন

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬

featured Image

আশুরা ইসলামের ইতিহাসে এক মহিমান্বিত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহাররমের ১০ তারিখকে বলা হয় ‘ইয়াওমে আশুরা’। এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক নয়; বরং আল্লাহর সাহায্য, সত্যের বিজয়, জুলুমের পরাজয় এবং ঈমানদারদের জন্য শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষ।

‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘দশ’। সে কারণেই মুহাররমের দশম দিনকে আশুরা বলা হয়। অনেকের ধারণা, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার কারণেই আশুরার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, কারবালার ঘটনার বহু আগেই এই দিনটি ছিল ফজিলতপূর্ণ ও সম্মানিত। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মানুষ আশুরার রোজা রাখত এবং কাবা শরিফে এ দিন গিলাফ পরানো হতো। পরে রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা ঐচ্ছিক হয়ে যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৯২)

আশুরার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা হলো—আল্লাহ তাআলা এই দিনে হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলকে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সমুদ্রে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “অতঃপর আমি মূসা ও তাঁর সঙ্গীদের সবাইকে রক্ষা করলাম। তারপর অপর দলকে ডুবিয়ে দিলাম।” (সুরা আশ-শুআরা: ৬৫-৬৬)

ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার রোজা রাখছে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, এ দিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “মুসার সঙ্গে তোমাদের চেয়ে আমাদের সম্পর্ক বেশি।” এরপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৪৩)

আশুরার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রোজা রাখা। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের সগিরা গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) চেয়েছিলেন মুসলমানরা যেন ইহুদি-খ্রিস্টানদের অনুকরণ না করে। তাই তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে, পরবর্তী বছর বেঁচে থাকলে তিনি নবম তারিখও রোজা রাখবেন। কিন্তু সে বছরের আগেই তিনি ইন্তিকাল করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪) এ কারণে ইসলামি চিন্তাবিদরা ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখাকে উত্তম বলেছেন।

সাহাবায়ে কেরামও আশুরার রোজাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। হজরত রুবাইয়্যি‘ বিনতে মুআউয়িজ (রা.) বলেন, তারা নিজেরাও রোজা রাখতেন এবং শিশুদেরও রোজায় অভ্যস্ত করতেন। শিশুরা ক্ষুধার কারণে কাঁদলে খেলনা দিয়ে তাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে ইফতার পর্যন্ত সময় পার করাতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬০)

৬১ হিজরির ১০ মুহাররমে কারবালার প্রান্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। এটি ইসলামের ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক ঘটনা, যা মুসলিম উম্মাহ গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তবে ইসলামী সূত্র অনুযায়ী, হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত আশুরার মর্যাদা সৃষ্টি করেনি; বরং আশুরা এর আগ থেকেই ফজিলতপূর্ণ দিন হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

আশুরাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের বর্ণনা ও প্রচলিত রেওয়াজ সমাজে দেখা যায়। তবে একজন মুসলমানের উচিত কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে এ দিনের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা। আশুরা কোনো শোকের দিন নয়, আবার শুধু আনন্দের দিনও নয়; এটি ইবাদত, আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের এক বিশেষ সুযোগ।

তাই ভিত্তিহীন কাহিনি, অতিরঞ্জন ও বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস থেকে দূরে থেকে সহিহ সুন্নাহ অনুসরণ করা, ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখা এবং এ দিনের শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করাই হওয়া উচিত প্রত্যেক মুসলমানের করণীয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ