কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের চার দিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের খুঁজছেন উদ্ধারকর্মীরা। ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৪৯৪ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪৯৬ জন।
দেশটির প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়া বুধবার সর্বশেষ হতাহতের তথ্য জানিয়ে বলেন, উদ্ধার অভিযান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
সাধারণত বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টাকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষকে জীবিত উদ্ধারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারীদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। তবে অতীতের বিভিন্ন দুর্যোগে এর চেয়েও বেশি সময় পর জীবিত মানুষ উদ্ধারের নজির রয়েছে।
ক্যালির মেয়র আলেহান্দ্রো এদের জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তারপরও জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না।
ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেরেইরা ও ক্যালি। পেরেইরায় ৮৩ জন এবং ক্যালিতে ৭৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। দেশজুড়ে সাড়ে ৯ হাজারের বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে।
পেরেইরায় ধসে পড়া একটি বেকারির নিচে আটকে থাকা এক ব্যক্তিকে উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চলছে। সেখানে রাস্তার বিক্রেতা পাবলো লোয়াইজা জীবিত থাকতে পারেন বলে আশা করছেন উদ্ধারকারীরা। বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপের নিচে সম্ভাব্য নড়াচড়া বা শব্দ শনাক্ত হওয়ার পর তল্লাশি আরও জোরদার করা হয়েছে।
ক্যালিতেও রাতভর উদ্ধার অভিযান চলছে। ভারী ক্রেন, বিশেষ সেন্সর ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করছেন উদ্ধারকারীরা। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা কারও শব্দ শোনা যায় কি না, তা নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময় পরপর উদ্ধারস্থলে সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা হচ্ছে।
শুধু পেশাদার উদ্ধারকারী নয়, সাধারণ মানুষও অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। ক্যালির তোরেস দেল লিমোনা আবাসিক এলাকায় বাসিন্দারা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে সহায়তা করছেন। সেনাবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকরাও সেখানে কাজ করছেন।
উদ্ধারস্থলে মানুষের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পর অনুসন্ধান আরও কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অতিরিক্ত শব্দ ও কম্পন কমে যাওয়ায় বিশেষ সেন্সরের মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের নিচে সম্ভাব্য নড়াচড়া শনাক্ত করা সহজ হচ্ছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে জরুরি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েয়া। দুর্যোগ মোকাবিলায় অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করেছেন তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষ খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি সামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় যাচ্ছেন। আহতদের চিকিৎসায় সহায়তার জন্য রক্তদান কেন্দ্রগুলোতেও মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
ভূমিকম্পের মাত্র কয়েক দিন আগে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন দে লা এসপ্রিয়েয়া। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে তার সরকারকে।
নির্বাচনী প্রচারে সরকারি ব্যয় কমানো ও নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। দুর্যোগের আগে রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার অর্থায়ন কমানোর পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা ছিল। অথচ ভূমিকম্পের পর জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে এই ব্যবস্থাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নতুন সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতার অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জও সরকারের সামনে থাকবে।
সূত্র: এএফপি
মন্তব্যসমূহ