মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৭ সালের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সব সরবরাহকারীর কাছ থেকে গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় পুরো বছরের পরিবর্তে আপাতত আগামী মার্চ পর্যন্ত আমদানির সময়সূচি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পেট্রোবাংলাকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহের সূচি প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উন্নতি হলে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানির পরিমাণ ও সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
পেট্রোবাংলা প্রাথমিকভাবে ২০২৭ সালে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে অন্তত ১০৩টি কার্গো পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল।
তবে সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ মোট ১২৮টি কার্গোর বিপরীতে এখন পর্যন্ত মাত্র ৭১টির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। ফলে চুক্তি থাকলেও নির্ধারিত সময়ে সব গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে পারে। সেই প্রত্যাশা থেকেই পুরো বছরের আমদানি পরিকল্পনা এখনই চূড়ান্ত না করে নমনীয় অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী কাতারএনার্জির সঙ্গে ২০২৭ সালে ৪০টি কার্গো সরবরাহের চুক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ২৬টি কার্গো দিতে পারবে বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ চুক্তিবদ্ধ পরিমাণের ৬৫ শতাংশ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে কাতারএনার্জির সহযোগী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি ২৪টি কার্গোর মধ্যে ১৮টি সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। দুই প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে কাতার থেকে মোট ৪৪টি কার্গো পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কাতারএনার্জি চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা সাময়িকভাবে পালন করতে না পারার ঘোষণা, অর্থাৎ ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ পরিকল্পনায়।
ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওকিউ ট্রেডিংয়ের (ওকিউটি) সঙ্গে ২০২৭ সালে ৩২টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের চুক্তি রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত করেনি।
ওকিউটি চুক্তির অর্ধেক, অর্থাৎ ১৬টি কার্গো দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ব্রেন্ট তেলের মূল্যসূচকের পরিবর্তে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) ভিত্তিতে দাম নির্ধারণের শর্ত দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রস্তাবে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) গ্যাসের দাম জেকেএম সূচকের চেয়ে শূন্য দশমিক ০৪ ডলার কম রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে পেট্রোবাংলা এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। বরং বিদ্যমান চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছে।
কাতার ও ওমানের বাইরে বিকল্প সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও গ্যাস সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গানভর ইউএসএ এলএলসি ২০২৭ সালে ছয়টি এলএনজি কার্গো সরবরাহ করবে। অন্যদিকে ফ্রান্সের টোটালএনার্জিস থেকে ১২টি কার্গো পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সেলেরেট গ্যাসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ১৪টি কার্গোর মধ্যে নয়টির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গ্যাস পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সামগ্রিক সরবরাহ ঘাটতি পুরোপুরি কাটবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির আওতায় নির্ধারিত পরিমাণ এলএনজি না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেড়েছে। তুলনামূলক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হওয়ায় সরকারের ব্যয়ও বাড়ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি খাতে ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতেও আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করবে পেট্রোবাংলা। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৭ সালের বাকি সময়ের এলএনজি আমদানি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।
সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।














মন্তব্যসমূহ