দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ২০২৮ সাল থেকে নতুন কারিকুলাম চালুর লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে। এতে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি খেলাধুলা, ব্যবহারিক শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বয়স, সক্ষমতা ও শেখার প্রয়োজন বিবেচনায় আরও কার্যকর ও শিশুবান্ধব শিক্ষাক্রম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের দায়িত্ব পেয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এতে বিদ্যালয়ভেদে পাঠদানের সময়ের পার্থক্য কমানোর পাশাপাশি প্রতিটি বিষয়ের পাঠ ও শিক্ষা উপকরণ সহজবোধ্য, বিজ্ঞানসম্মত এবং বয়সোপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শিশুদের কাছে পড়াশোনা আনন্দদায়ক করে তুলতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষণীয় খেলনা ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষকরা পাঠ্যবইয়ের বিষয়গুলো আরও সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন। পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান বাড়াতে ডিজিটাল কনটেন্ট, ব্যবহারিক শিক্ষা, গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি বাড়াতে মিড-ডে মিল কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে দেশের ১৫১টি উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু রয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোকে এর আওতায় আনতে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ২০২৭ সালের মধ্যেই দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থীকে দুপুরে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া সম্ভব হবে।
খাবারের মান ও বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মায়েদের নিয়ে গঠিত ‘মাদার্স কমিটি’ তদারকি করছে। পাশাপাশি অনিয়ম প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতির আওতায় মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতেও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সরকার।
এ কাজে গুগলসহ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষকদের দেওয়া ট্যাব কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে কোনো বিদ্যালয়ে নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ হচ্ছে কি না কিংবা কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
দেশের দুর্গম অঞ্চলে বিদ্যুৎবিহীন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য সৌরবিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগও রয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন ববি হাজ্জাজ। তাঁর মতে, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতটা শিখছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ জন্য কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি, এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও শিশুদের প্রয়োজন বিবেচনার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শৌচাগার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা শিশুদের উপযোগী করার পাশাপাশি নদীভাঙনপ্রবণ ও পাহাড়ি এলাকার ভৌগোলিক পরিস্থিতি অনুযায়ী বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।














মন্তব্যসমূহ