যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নতুন ইতিহাস গড়েছেন একাধিক মুসলিম প্রার্থী। দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি কংগ্রেস ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় জয় পেয়েছেন মুসলিম ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাজনীতিকরা। এবারের নির্বাচনে নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী এবং এলজিবিটিকিউ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত জয়গুলোর একটি এসেছে মিশিগান থেকে। সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট আবদুল আল-সাইয়েদ।
৪২ বছর বয়সী আল-সাইয়েদ পেশায় চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। এর আগে তিনি মিশিগানের ওয়েইন কাউন্টি এবং ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ধনীদের ওপর কর বাড়ানো এবং রাজনীতিতে করপোরেট প্রভাব নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। পাশাপাশি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিতেও সোচ্চার ছিলেন।
প্রচারের সময় তাঁর মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে রিপাবলিকান শিবিরের একাধিক নেতা আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। এমন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেই জয় নিশ্চিত করেন আল-সাইয়েদ।
নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান গ্রেগ মেলেকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট আদম হামাওয়ি। এর মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যটি থেকে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
মিসরীয় বংশোদ্ভূত হামাওয়ি একজন প্লাস্টিক ও পুনর্গঠনমূলক সার্জন। সাবেক মার্কিন সেনা চিকিৎসক হিসেবে ইরাক যুদ্ধে আহত সেনাদের চিকিৎসা করেছেন তিনি।
এ ছাড়া বসনিয়া, সুদান, লেবানন ও সিরিয়ায় মানবিক চিকিৎসা কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গাজায় গিয়ে চিকিৎসাসেবাও দিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনী প্রচারে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ, চিকিৎসা ও শিক্ষাঋণ বাতিল এবং ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নেন হামাওয়ি।
ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সিনেটের ২৬তম ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান ডারবি হিলসকে হারিয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম ডেমোক্র্যাট নাবিলা সৈয়দ।
নির্বাচনে নাবিলা পেয়েছেন ৫৭ শতাংশ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিলস পেয়েছেন ৪৩ শতাংশ। এর মাধ্যমে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে এসেছে।
এর আগে ২০২২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ইলিনয়ের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন নাবিলা। এবার অঙ্গরাজ্যের সিনেটে নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছেন তিনি।
অন্যদিকে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটের ১২তম ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী আবের কাওয়াস।
কুইন্সের বাসিন্দা কাওয়াস একজন কমিউনিটি সংগঠক। তাঁর বাবা-মা ফিলিস্তিনি। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ও ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি।
আবাসন, ভাড়াটিয়াদের অধিকার, অভিবাসীদের নিরাপত্তা, শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জর্জিয়ার রাজনীতিতেও মুসলিম ও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রুয়া রোমান ২০২২ সালে জর্জিয়ার প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী ও প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন।
এবার অঙ্গরাজ্যের সিনেটের সপ্তম ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান আইজাজ শেখের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। সংযুক্ত প্রতিবেদনে প্রাথমিক ফলে তাঁর বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেখানে চূড়ান্ত ফল নিশ্চিত করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতাও বজায় রয়েছে।
মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট ইলহান ওমর। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া ওমর শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। ২০১৮ সালে তিনি ও রাশিদা তালিব দেশটির কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
মিশিগানের ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আবারও জয় পেয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাশিদা তালিব। তিনি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।
এ ছাড়া ইন্ডিয়ানার সপ্তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট আন্দ্রে কারসন। ২০০৮ সালে প্রথম কংগ্রেসে নির্বাচিত হওয়া কারসন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দ্বিতীয় মুসলিম কংগ্রেস সদস্য।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে শুধু মুসলিম প্রার্থীরাই নন, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও নতুন ইতিহাস গড়েছেন।
নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান গ্রেগ হালকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেব হাল্যান্ড। তিনি লেগুনা পুয়েবলো জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
জর্জিয়ায় রিপাবলিকান রিক জ্যাকসনকে হারিয়ে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস। আটলান্টার সাবেক এই মেয়র জর্জিয়ারও প্রথম নারী গভর্নর হচ্ছেন।
অন্যদিকে ফ্লোরিডায় জয় পেয়েছেন রিপাবলিকান বায়রন ডোনাল্ডস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদে নির্বাচিত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান।
ইলিনয় থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জুলিয়ানা স্ট্র্যাটন। রিপাবলিকান ডন ট্রেসিকে হারিয়ে তিনি অঙ্গরাজ্যটি থেকে নির্বাচিত দ্বিতীয় কৃষ্ণাঙ্গ নারী সিনেটর হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
নিউ হ্যাম্পশায়ারে রিপাবলিকান জন ই. সুনুনুকে হারিয়ে প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ হিসেবে মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাস।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ডসের গভর্নর নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন স্টেসি প্লাসকেট। তাঁর বিজয় দেশটির অধিভুক্ত অঞ্চলে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার নজির তৈরি করেছে।
আলাস্কার সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান ড্যান সুলিভানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট মেরি পেলটোলা। সংযুক্ত প্রতিবেদনে প্রাথমিক গণনায় তাঁর এগিয়ে থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে র্যাঙ্কড-চয়েস ভোট গণনা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে মিনেসোটায় ডেমোক্র্যাট অ্যামি ক্লোবুচার গভর্নর নির্বাচনে জয়ী হয়ে অঙ্গরাজ্যটির প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। বিশেষ করে আবদুল আল-সাইয়েদের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়া এবং কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় মুসলিম প্রার্থীদের সাফল্য দেশটির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সূত্র : রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ